দুই বছর আগে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়েছিল শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার সময় এসে দেখা গেল, তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী আর পরীক্ষাই দিতে পারেনি। আর এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, অনেক শিক্ষার্থী নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায় পাস করলেও তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়ায় তাদের এসএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফরম পূরণের সুযোগ দেয়নি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জিপিএ-৫ এবং শতভাগ পাসের সুনাম ধরে রাখতেই নামিদামি কিছু প্রতিষ্ঠান এমন বেআইনি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি কোনো কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় একটি বিষয়ে ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ এবং বাকি সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও চূড়ান্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এসব অভিযোগ সামনে আসে। এরপর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। ইতোমধ্যে কয়েকটি অভিযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এবার শতভাগ পাস করা ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবে শিক্ষা বোর্ড। সেখানে শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষার ফল, নবম শ্রেণির নিবন্ধন, ফরম পূরণ এবং এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যাবতীয় তথ্য যাচাই করা হবে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়েও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, তা খুঁজে বের করা হবে। একই সঙ্গে ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস না করায় তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।
১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত ফরম পূরণ করে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত হওয়ার পরও প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষার প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে। এর মধ্যে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষা মূলত শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য নেওয়া হয়। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করার পর শুধু কাঙ্ক্ষিত জিপিএ না পাওয়ার কারণে তাকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে না দেওয়া নিয়মবহির্ভূত। কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হলে বা বোর্ডের নির্ধারিত অন্য কোনো যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ হলে তাকে ফরম পূরণ থেকে বিরত রাখার সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু শুধু জিপিএ-৫ না পাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণে জিপিএ-৫ ও পাসের হারকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে যত বেশি জিপিএ-৫, তত বেশি প্রতিষ্ঠানের সুনাম—এমন একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান কম ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ভালো দেখালেও শিক্ষার প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যায়।
এবারের পরিসংখ্যানেও এর উদাহরণ পাওয়া গেছে। নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিল ৬১৬ জন। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ ২৩৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেনি।রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ২ হাজার ১৩৪ জন। এর মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে ২ হাজার ৭২ জন। ফলে ৭০ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
মনিপুর স্কুলে নিবন্ধিত ছিল ৩ হাজার ৪৯০ জন। পরীক্ষা দিয়েছে ৩ হাজার ৩৫৯ জন। অর্থাৎ ১৩১ জন পরীক্ষার্থী বাদ পড়েছে। মতিঝিল আইডিয়ালে নিবন্ধিত ২ হাজার ৭৭০ জনের বিপরীতে ফরম পূরণ করেছে ২ হাজার ৭২২ জন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের কিছু নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বোর্ড পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের বাছাই প্রক্রিয়া চলে। টেস্ট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কম নম্বর বা কম জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ডেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়। কোথাও কোথাও অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ফরম পূরণ করে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শুধু পাসের হার বা জিপিএ-৫ দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নির্ধারণ করা উচিত নয়। নবম শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল, তাদের মধ্যে কতজন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, কতজন পাস করেছে এবং কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে—সব তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এখন শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে আসলেই কতজন শিক্ষার্থী নিয়মবহির্ভূতভাবে এসএসসি পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, সেটিই বেরিয়ে আসার অপেক্ষা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন