চলনবিলে প্রশাসনের অভিযানের পরও থামছে না শামুক নিধন। ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এখন শিকারিরা ভোরের বদলে সন্ধ্যায় হাট বসিয়ে প্রকাশ্যে শামুক বিক্রি করছেন। এতে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সরেজমিনে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কামারশোন ও কুন্দইল পয়েন্টে দেখা যায়, বিলের পানি প্রায় নেমে গেছে।
নৌকাভর্তি শামুক নিয়ে শিকারিরা রাস্তার কাছে বাতি জ্বালিয়ে বস্তায় ভরে পাইকারদের কাছে বিক্রি করছেন। পরে এসব শামুক ট্রাকযোগে বিভিন্ন হাঁস ও মাছের খামারে পাঠানো হচ্ছে।
শামুক ব্যবসায়ী জিল্লুর হোসেন বলেন, ‘আপনাদের লেখালেখিতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসন জরিমানা করায় আমরা এখন ভোরের বাজার সন্ধ্যায় বসাচ্ছি।
সন্ধ্যায় সাধারণত প্রশাসনের লোকজন আসে না, তাই সময় বদলে ব্যবসা করছি।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও তা লোক দেখানো। চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এস. এম. মিজানুর রহমান জানান, প্রশাসন কোনোভাবেই আন্তরিক নয়। লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে দায় সারছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
জানা যায়, তাড়াশ উপজেলার দিঘী সগুনা, কুন্দইল, কামারশোন, মান্নাননগর, ঘরগ্রাম, বিলনাদো, মাগুরা বিনোদ, হামকুড়িয়া, মাকড়শোনসহ ২০-২৫টি পয়েন্টে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ নৌকাযোগে স্থানীয় লোকজন অবৈধভাবে শামুক সংগ্রহ করছেন। প্রতিদিন দুই থেকে তিন টন শামুক ও ঝিনুক আহরণ করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে চলনবিলে প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার শামুক বিক্রি হয়।
স্থানীয় দরিদ্র কৃষক ও মৎস্যজীবীদের অগ্রিম দাদন দিয়ে ছোট নৌকা কিনে দিয়েছেন শামুক ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় পাইকাররা এসব শামুক ক্রয় করে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মাছের খামারে বিক্রি করছেন।
আব্দুর রশিদ নামের এক শিকারি জানান, বর্ষাকালে মাছ না পাওয়ায় জীবিকার প্রয়োজনে তারা শামুক ধরছেন। সারা দিন মাছ ধরে পাঁচ শ টাকাও পাওয়া যায় না, কিন্তু এক নৌকা শামুক ধরলে চার-পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি চলনবিলের একদিকে পদ্মা, অন্যদিকে যমুনা। বর্ষায় পদ্মা ও যমুনার পানি আত্রাই, বড়াল, গুমানীসহ বিভিন্ন নদী দিয়ে এই বিলে প্রবেশ করে এবং বন্যার প্রকোপ কমায়। শীতকালে বিলের পানি নদীতে ফিরে গিয়ে প্রবাহ বৃদ্ধি করে। বিলের অভ্যন্তরে রয়েছে ৪৭টি নদী, ১৬৩টি বিল, ৩০০টির বেশি খাল, প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পুকুর এবং কয়েকটি বড় পথার।
এখানে ১০৫ প্রজাতির দেশি মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭ প্রজাতির উভচর, ৩৪ প্রজাতির পাখি এবং অসংখ্য জলজ-স্থলজ উদ্ভিদ রয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ, অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ফলে অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে।
স্থানীয় মৎস্য ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগে বিলের মাছই ছিল স্থানীয় মানুষের জীবিকা। কিন্তু এখন কীটনাশক ও কারেন্ট জালের ব্যবহার, মা মাছ নিধন, এবং অভয়াশ্রম না থাকার কারণে মাছের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে অনেক মৎস্যজীবী পেশা পরিবর্তন করে শামুক শিকার করছেন। তাদের মতে, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে শামুক নিধন বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এক সময় আদিবাসী সাঁওতাল, উরাঁও, মাহাতো, সিং, বড়াইক ও মুন্ডা জনগোষ্ঠী খাদ্য হিসেবে শামুক খেতেন। এখন রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের রেস্তোরাঁয় শামুকের মাংস জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অনেকেই গরম পানিতে শামুক সিদ্ধ করে মাংস প্যাকেটজাত করছেন। কেউ শামুকের মাংস লবণ–হলুদ মেখে শুকিয়ে শুঁটকি বানাচ্ছেন, যা চোরা পথে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। অন্যদিকে শামুকের খোলস পাউডার করে সার ও প্রসাধনী তৈরিতেও ব্যবহার হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ বলেন, ‘২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে শামুককে জলজ প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হলেও আইনটি যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। শামুক পানির ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে পানি বিশুদ্ধ রাখে, মাছের খাদ্য সরবরাহ করে, এবং মাটির উর্বরতা বাড়ায়। শামুক প্রকৃতির ইকোসিস্টেম রক্ষায় অপরিহার্য উপাদান।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মলাস্কান রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহরিয়ার শোভন ও নেদারল্যান্ডসের ভ্রিজে ইউনিভার্সিটির ড. তাকুমি সাইতো গেছো শামুকের জীবনচক্র নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা বারসিক ইনস্টিটিউটের শেখ তানজির আহমেদ ও আসাদুল ইসলাম ‘মানুষ শামুককে প্রকৃতির বন্ধু হিসেবে কতটা চেনে এবং শামুক কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান’ শীর্ষক গবেষণায় বলেছেন, শামুক কমে গেলে পানি নষ্ট হয়, মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, দেশি মাছ ও হাঁসের খাদ্য কমে যায় এবং ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
তাদের গবেষণায় বলা হয়, শামুক কমে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রজনন মৌসুমে শামুক ধরা, ডিমওয়ালা শামুক নিধন, আশ্রয়স্থল ধ্বংস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, এবং কীটনাশকের ব্যবহার।
গবেষকদের পরামর্শ, প্রতিটি ঘের মালিককে নিজ ঘেরের জন্য শামুক চাষে উৎসাহিত করা, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো, জুন-আগস্ট প্রজনন মৌসুমে শামুক ধরা নিষিদ্ধ করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি সাইনবোর্ডে শামুকের উপকারিতা তুলে ধরা প্রয়োজন।
সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুর রহমান জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইনে শামুক নিধন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু না থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, ‘আমরা অবৈধভাবে শামুক নিধনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। তবে চলনবিল এত বিস্তীর্ণ যে, সব জায়গায় নজরদারি সম্ভব হয় না। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছি।’
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে শামুক নিধন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেন।’
নিউজ ডেস্ক
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন