ভারতের ভিন্য রাজ্যগুলোয় বাঙালি শ্রমিকদের হেনস্থা করা হচ্ছে। বাংলাদেশি বলে ভাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ তুলে বার বার সরব হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। এমন কী পথে নেমে ‘ভাষা আন্দোলনের’ মিছিলও করছেন। তবে এবার খোদ কলকাতায় উঠল বাঙালি হেনস্থার অভিযোগ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে বেধড়ক মারধর করার অভিযোগ উঠেছে শিয়ালদহ ব্রিজের নিচের ব্যবসায়ীদের একাংশের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় মুচিপাড়া থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কতজনকে গ্রেফতার হয়েছে তা জানায়নি পুলিশ। আহত শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন। তাদের সাথে পুলিশ কাউকে দেখা করতে দিচ্ছে না।
জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারমাইকেল হোস্টেলের একজন শিক্ষার্থী শিয়ালদহ ব্রিজের নিচে মোবাইলের কভার কিনতে যান। কেনার সময় ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে দর কষাকষি চলছিল বাংলা ভাষায়। দামাদামির এক পর্যায়ে ওই বিক্রেতার সঙ্গে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর দাবি, সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা হিন্দিভাষী। তিনি হিন্দিতে তাকে গালিগালাজ শুরু করেন। ছাত্রটি বলে, যা বলার বাংলায় বল। এরপরই বাঙালি ছাত্রটির উপর বাংলাদেশি বলে তার উপর চড়াও হয় ওই ব্যবসায়ী। এরপর ওই শিক্ষার্থী হোস্টেলে এসে নিজের সহপাঠীদের সবকিছু বলে এবং ভারতীয় বাঙালিকে বাংলাদেশি বলায় কঠোর প্রতিবাদ জানাতে ১০-১২ জনকে নিয়ে আবারও ওই দোকানে যান। দোকানে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমার মাতৃভাষায় কথা বলছি, আমাদের বাংলাদেশি বলছেন কেন? এতে উত্তজনা বাড়লে আশপাশের হিন্দিভাষী ব্যবসায়ীরা তাদের উপর ছুরি, কাটারি, হকি স্টিক দিয়ে তাদের আঘাত করে। এতে চারজন গুরুতর আহত হন।
এ ঘটনার খবর পেয়ে মুচিপাড়া থানায় আসেন বাংলা পক্ষের গর্গ চট্টোপাধ্যায়। ছাত্রদের সাথে সঙ্গে কথা বলেন পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে কথা বলে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবি জানান। গর্গ বলেছেন,‘১২ জন বাঙালীকে রক্তাক্ত করেছে হিন্দিভাষী ওই ব্যবসায়ীদের একাংশ। তাদের সংখ্যা ২০- ৩০ ছিল। ফলে তাদের সাথে পেরে ওঠেনি শিক্ষার্থীরা। ওই ব্যবসাসীরা হলেন এক একজন বাঙালি শত্রু।’
তিনি আর বলেন, ‘কত বড় সাহস! বাংলা ও বাঙালি রাজত্ব সেই শিয়ালদহ স্টেশন, যেখানে প্রতিদিন লাখো লাখো বাঙালি যাতায়াত করেন। সেখানে এই উর্দুভাষী, হিন্দিভাষীদের এত ঔদ্ধত্য? এর থেকে স্পষ্ট যে, বাংলার মাতৃভূমি বেহাত হয়ে যাচ্ছে হিন্দিভাষী শত্রুদের হাতে।’ এবং তার জন্য তিনি রাজ্যের শাসক দলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করেছেন গর্গ।
গর্গ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা গুজরাটে মার খাবো, রাজস্থানে মার খাবো, এখন কলকাতাতেও মার খাবো? মানলাম ওড়িশায় বিজেপি সরকার, উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকার আছে। কলকাতায় তো বিজেপি নেই। তাহলে এই অপরাধীরা এত সাহস পায় কি করে? তিনি(মমতা) ভিনরাজ্যে হেনস্থা হওয়া বাঙালি শ্রমিকদের জন্য ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প বানিয়েছে। তাতে কাজ হবে কি? কারণ বাংলায় তো বাঙালিরা সুরক্ষিত নয়!’
গর্গ আর বলেন, ‘বাংলা তো বিজেপি শাসিত রাজ্য না, তাও কেনো হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি মার খাচ্ছে হিন্দিভাষীদের হাতে। এবার আমাদের কি করা উচিত? আমাদের কি দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়নি? প্রতিরোধ করা ছাড়া আর কোন জায়গা আছে? বাঙালি কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় ভয়ঙ্করভাবে ফুঁসছে। কেনো ভূমি পুত্র সংরক্ষণ হলো না? মুখ্যমন্ত্রী নিজে বলেছেন. ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ২২ লাখ পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিক রয়েছে। আর পশ্চিমবঙ্গে দেড় কোটি হিন্দি-উর্দুভাষী শ্রমিক রয়েছে। এবার কি তাদের উপর অত্যাচার করা উচিত নয়? তাদের ধরে ওই রাজ্যগুলো ফেরত পাঠানো উচিত নয়? আগুন নিয়ে খেলা শুরু করেছে বাঙলা ও বাঙালির শত্রুরা।
এ ঘটনায় বিজেপি নেতা সজল ঘোষ বলেছেন, ‘শিয়ালদহ মানে গেটওয়ে অফ কলকাতা। যদি সেখানেই বাংলাদেশি বলে, বাঙালিদের উপর অত্যাচার করা হয় তাহলে, অবিলম্বে পুলিশ,মন্ত্রীর(মমতা) সবটাই তদন্ত করে দেখা উচিত।’ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘এটা ধিক্কার জানিয়ে শেষ হচ্ছে না। আগে তো ভিন্য রাজ্যে হত। এখন এখানে হচ্ছে। এই পরিবেশ তৈরি করেছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী।’