রাজধানীর সচিবালয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলের এ ঘটনায় অন্তত ৭৫ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত দুই শিক্ষার্থী সামির (১৭) ও নাফিসাকে (১৭) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং মঙ্গলবারের এইচএসসি পরীক্ষা দেরিতে স্থগিত ঘোষণা করার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবের পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয় এলাকায় আন্দোলন শুরু করেন। তাদের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্যরা খাতা পুনর্মূল্যায়নের দাবি নিয়ে যুক্ত হয়।
এক পর্যায়ে ফটক ভেঙে সচিবালয়ে ঢুকে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তাদের বের করতে প্রথমে লাঠিপেটা করে পুলিশ। পরে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। শিক্ষার্থীরাও জবাব দিলে সচিবালয়ের সামনে থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। চার ঘণ্টার বেশি চলে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজনকে আটকের অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। তবে শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর রাতে গণমাধ্যমকে জানান, কাউকে আটক করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার-পাঁচজনকে থানায় আনা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ঘটনায় সোমবার গভীর রাতে গতকালের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তাঁর ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানান। শিক্ষার্থীরা জানান, গভীর রাতে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা আসায় অনেকে জানতে পারেনি; প্রস্তুতি নিয়ে হলে গিয়ে ফিরে আসে।
এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে গতকাল দুপুরে প্রথমে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় জড়ো হন ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করতে যান তারা। সেখানে ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ, নূর মোহাম্মদ কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ, কমার্স কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, মিরপুর কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থী আসেন। দুপুর দেড়টার দিকে সচিবালয়ের সামনে যান তারা।
শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয়ের ৩ নম্বর ফটকের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া, ভুয়া’, ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। সচিবালয়ে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সচিবালয়ের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
দফায় দফায় সংঘর্ষ
বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সচিবালয়ের একটি ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীরা। সেখানে পুলিশেরসহ অন্তত ১০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ ও সেনাসদস্যরা শিক্ষার্থীদের বের করে দেন। এরপর বিকেল ৪টা ১০ মিনিটের দিকে সচিবালয়ের সামনে উভয় পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে বেশ কয়েকজন পুলিশ ও সেনাসদস্য আহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মুহূর্তে সচিবালয়ের সামনের সড়ক ফাঁকা হয়ে যায়। তবে কিছু সময় পর সাড়ে ৪টার দিকে জিপিও মোড় এলাকায় আবারও সংঘর্ষ বাধে।
এ সময় কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে পুলিশ। শিক্ষার্থীরাও পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়েন। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা পুরানা পল্টন মোড় ও বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ ফটকের দিকে সরে যান। সন্ধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সিটি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর বলেন, ‘মাইলস্টোনে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল, বারবার বলার পরও এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়নি। রাত ৩টায় যখন স্থগিত করেছে, তখন সবাই জানতেও পারেনি। এগুলো স্পষ্ট দায়িত্বে অবহেলা। আমরা এই শিক্ষা উপদেষ্টা ও সচিবকে চাই না। তাদের পদত্যাগ নিশ্চিত না করে ঘরে ফিরে যাব না।’
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান আরেফিন মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির সুষ্ঠু তদন্ত ও সঠিক তথ্য প্রকাশ করার দাবি জানান।
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আদিব রহমান বলেন, ‘পুরো জাতি যেখানে মর্মাহত, রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা হয়েছে, সেখানে শিক্ষা উপদেষ্টার কোনো খবর নাই। পরীক্ষা স্থগিত করতে দুই উপদেষ্টাকে (মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুইয়া) শিক্ষা উপদেষ্টার বাসায় যাওয়া লাগল। এ রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন উপদেষ্টার দরকার নাই। জুলাই আন্দোলনে আমাদের বন্ধু, ভাই জীবন দিছে। আমাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এমন উপদেষ্টার থাকার প্রশ্নই আসে না।’
আহত ৭৫, হাসপাতালে ভর্তি ২
সংঘর্ষে লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে আন্দোলনরত ৭৫ জন আহত ও অসুস্থ হন। তাদের সবাই তরুণ। আহতদের মধ্যে রয়েছেন– মো. হাসান, তানভীর, সাকিব, বেরাতুল, রিফাত, আবির মাহমুদ, তানভীর, রিফাত, বিজন, তামিম, ইমন, সিয়াম, মেহেদী, সাদমান, সামিরা, মারুফ, সাকিব, মাহিম, রোহান, হাসিব, সায়েম, জিদান, রায়হান, রোমান, প্রান্ত, মাহিদ অন্তু, বিশাল, ইমরান, আহনাদ, মাহি নাঈম, সাফি, স্বাধীন, তাসিন, ইমরান, ধ্রুব, শান্ত, তামিম, তন্ময়, জিসান, আজাহার, শাহেদ খান, জিসান, পারভেজ, নাঈম, নিহান, নাফিজ, ইমাদ, শাহিন প্রমুখ।
খাদেম আলী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষার্থী জিওন শাহরিয়ার হাত-পা ও পেটে আঘাত পেয়েছেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘আমরা সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলন করছিলাম। দাবির বিষয়ে বিকেলে কথা বলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ৩০ মিনিট সময় বেঁধে দিই। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ লাঠিচার্জ করে, রাবার বুলেট ছোড়ে। হাসপাতালে গেলে কর্মকর্তারা আমাদের চলে যেতে বলেন। হাসপাতালেও আমাদের নিরাপত্তা নেই।’
শিক্ষা সচিবকে প্রত্যাহার
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব সিদ্দিক জুবাইরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গতকাল দুপুরে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
সারাদেশে বিক্ষোভ
শিক্ষা উপদেষ্টা ও শিক্ষা সচিবের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে চট্টগ্রামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দুপুর দেড়টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা শিক্ষা বোর্ডের সামনে সড়ক অবরোধ করেন। বিমান দুর্ঘটনায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের মৃত্যুকে ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা। এতে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) নেতাকর্মী অংশ নেন।
যশোর শিক্ষা বোর্ড ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করেন শিক্ষার্থীরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
বরিশালের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করায় দক্ষিণাঞ্চল থেকে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে কয়েকশ শিক্ষার্থী নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনের সড়ক অবরোধ করেন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সামনে জকিগঞ্জ সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও গায়েবানা জানাজা পড়েন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর আগে সিলেট শহীদ মিনারে অবস্থান ও সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন তারা।
নরসিংদী সরকারি কলেজসংলগ্ন পৌর পার্ক থেকে বিক্ষোভ মিছিল শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। দিনাজপুরে বেলা ৩টার দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ডের সামনে জড়ো হন। পরে তারা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান ফটকে তালা দেন। অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রাজবাড়ীতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী ও এইচএসসি-২০২৫ ব্যাচ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ হয়েছে। নওগাঁয় একই দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।
নওগাঁয় বিক্ষোভ করেছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। একই দাবিতে কুমিল্লা নগরীর পূবালী চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও করে। পরে তারা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে দাবির বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময় করে।