বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রভাবকেই বলা হচ্ছে “ব্রেইন রট”, যা ২০২৪ সালে অক্সফোর্ডের “ওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার” নির্বাচিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বৈজ্ঞানিক রোগ নয়, বরং একটি সামাজিক উপসর্গ। কম মানের, তুচ্ছ ও নিরর্থক ভিডিও দেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর ফলে মনোযোগ কমে যায়, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি সৃষ্টি হয়।
কীভাবে হয় ব্রেইন রট?
এখনও গবেষণায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণ না মিললেও, ধারণা করা হয় ডোপামিন হরমোন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে করতে মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে শুরুতে ভালো লাগলেও পরবর্তীতে অতিরিক্ত উদ্দীপনার কারণে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
ব্রেইন রট যেকোনো বয়সী মানুষেরই হতে পারে। তবে বিশেষ করে কিশোরী মেয়েরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, কারণ তারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে।
ড. গ্যারি স্মল বলেন, “এই সময়ে তারা বই পড়তে, সৃজনশীল কোনো কাজ করতে বা বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তব যোগাযোগে সময় দিতে পারত।”
কী কী আচরণে বোঝা যায় আপনি ব্রেইন রটে আক্রান্ত?
- আপনি যদি নিয়মিত—
- ইউটিউব ভিডিও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখে ফেলেন,
- একসঙ্গে স্ক্রল, টেক্সট ও ইমেইল চেক করেন,
- ভিডিও গেম খেলেন,
- বা “ডুমস্ক্রোলিং” করেন (অবিরাম নেতিবাচক সংবাদ দেখেন),
- তাহলে আপনি ব্রেইন রটের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
মনোযোগের ঘাটতি: ছোট ছোট ভিডিও দেখে অভ্যস্ত মস্তিষ্ক বড় বা জটিল কোনো কাজ করতে চায় না।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার অনেক সময় মনোযোগ নষ্ট করে, ফলে অনেক কিছুই মনে রাখা কঠিন হয়।
সমস্যা সমাধানে দুর্বলতা: অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স পাতলা করে দিতে পারে, যা সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
উদ্বেগ ও মানসিক চাপ: নেতিবাচক কনটেন্ট বেশি দেখা মানেই মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মাত্রা বাড়া।
ব্রেইন রট থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?
স্ক্রিন টাইমে সীমা নির্ধারণ: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্ক্রিনে থাকবেন না।
মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করুন: এটি মনোযোগ বাড়ায় এবং অবচেতনভাবে স্ক্রল করার অভ্যাস কমায়।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন: ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায় এবং নিউরোপ্লাস্টিসিটি উন্নত করে।
বই পড়ুন: এটি মনোযোগ বাড়ায় এবং ভাষাজ্ঞান ও চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত রাখে।
মাল্টিটাস্কিং কমান: একসঙ্গে একাধিক কাজ করলে আপনার মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
বাস্তব জীবনে মেলামেশা করুন: সামনা-সামনি যোগাযোগ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে ও বিষণ্নতা কমায়।
প্রকৃতির সংস্পর্শে যান: বাইরে সময় কাটান, স্ক্রিন থেকে নিজেকে একটুখানি আলাদা করুন।
এক সপ্তাহের ডিজিটাল ডিটক্স করলেই আপনি মানসিকভাবে অনেকটা হালকা অনুভব করবেন।
“ব্রেইন রট” হলো এক ধরনের মানসিক ও চিন্তাশক্তির অবক্ষয়, যা কমদামী ও অব্যবহৃত ইন্টারনেট কনটেন্টের মাধ্যমে ঘটে। অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ও স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কে ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যার ফলে দেখা দেয় মনোযোগের অভাব, স্মৃতিভ্রংশ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা।
তাই প্রযুক্তির ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখাই হচ্ছে মস্তিষ্কের সুস্থতা রক্ষার মূল চাবিকাঠি।