গাজার উত্তরে জাতিসংঘের ত্রাণ ট্রাকের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৬৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, এমন তথ্য দিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রোববারের এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ডজনখানেক মানুষ। শুধু শনিবারেই অনুরূপ হামলায় ৩৬ জন নিহত হন এবং দক্ষিণ গাজার অন্য একটি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে আরও ৬ জনের মৃত্যু ঘটে।
রোববার পুরো গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মোট ৯০ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ইসরায়েল দেইর আল-বালাহ এলাকার বাসিন্দাদের নতুন করে বাড়িঘর ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। সেখানে রয়েছে লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষ।
২ মাসের বেশি সময়ের যুদ্ধ গাজার অনেক অংশকে পরিণত করেছে এক ধ্বংসস্তূপে। খাদ্যসংকটে বহু মানুষ অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় অনাহারে ১৮ জন মারা গেছে, এবং ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে পুষ্টিহীনতায়। ৬০,০০০ শিশু অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছে, যাদের অনেকে এখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে।
বাসিন্দারা জানান, বিমান হামলায় তিনটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। আতঙ্কে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা "তাৎক্ষণিক হুমকি" মোকাবিলায় জনসমাগম লক্ষ্য করে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। তবে তারা দাবি করেছে, হতাহতের সংখ্যা "বাড়িয়ে বলা হয়েছে" এবং ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রাণবাহী ট্রাক লক্ষ্যবস্তু করে না।
গাজার বাসিন্দা ও নার্স জিয়াদ বলেন,
"প্রতিদিন সকালে উঠেই আমি আমার পাঁচ সন্তানের জন্য এক টুকরো রুটি খুঁজে বেরোই। কিন্তু পাই না। যারা বোমায় মরেনি, তারা ক্ষুধায় মারা যাবে।"
তিনি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কমপক্ষে দুই মাসের একটি যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন।”
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNRWA) জানায়, তাদের কাছে তিন মাসের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত আছে, কিন্তু ইসরায়েল তা ঢুকতে দিচ্ছে না।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়,
“গাজায় মানবিক ত্রাণ প্রবেশকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে তা কার্যকর করতে কাজ করছি।”
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (WFP) জানায়, গাজায় প্রবেশের পর তাদের ২৫টি ট্রাকের একটি কনভয় "ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড়ে" পড়ে, যাদের ওপর পরে গুলি চালানো হয়। সংস্থাটি বলেছে, "মানবিক ত্রাণ নিতে আসা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
হামাস জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি বন্দি বিনিময় ও যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আলোচনা চলছে কাতারে, তবে এখনও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দেইর আল-বালাহে নতুন করে সামরিক চাপ প্রয়োগের পেছনে উদ্দেশ্য হতে পারে হামাসকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা, এমন মত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। ইসরায়েল ও হামাস কাতারে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ১,২০০ জনকে হত্যা এবং ২৫১ জনকে অপহরণ করে গাজায় নিয়ে যায়।
এরপর থেকে ইসরায়েলি অভিযানে ৫৮,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।