বিলিয়নিয়ার ও টেসলার প্রধান নির্বাহী এলন মাস্ক ট্রাম্প প্রশাসন থেকে পদত্যাগ করছেন। তিনি একটি ব্যতিক্রমধর্মী দক্ষতা বৃদ্ধির অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার মধ্যে একাধিক ফেডারেল সংস্থাকে আমূল পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত তিনি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রজন্মগত ব্যয় সাশ্রয় করতে ব্যর্থ হন।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বুধবার রাতে রয়টার্সকে জানান, “তার পদত্যাগ কার্যক্রম আজ রাত থেকেই শুরু হবে।” এর কিছু আগেই মাস্ক তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান, কারণ তিনি সরকারি দক্ষতা বিষয়ক বিভাগে বিশেষ সরকারি কর্মচারী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শেষ করছেন। তাঁর বিদায় ছিল দ্রুত ও আনুষ্ঠানিকতা-বিহীন। একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায়ী আলোচনা হয়নি। সূত্রটি আরও জানায়, মাস্কের বিদায়ের সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায়ের স্টাফদের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
যদিও তাঁর প্রস্থান প্রসঙ্গে বিস্তারিত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়, তিনি পদত্যাগ করেন একদিন পরেই যখন তিনি ট্রাম্পের মূল কর বিলের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এই বিল খুব ব্যয়বহুল এবং এটি ইউএস ডিওজি সার্ভিসে তাঁর কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। হোয়াইট হাউসের কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা, বিশেষ করে উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার, মাস্কের এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হন এবং রিপাবলিকান সিনেটরদের ফোন করে প্রেসিডেন্টের কর বিলের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে হয় বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
মাস্ক এখনও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হলেও, ধীরে ধীরে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ট্রাম্পের অভিষেকের পর, মাস্ক দ্রুতই এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর আশেপাশে আবির্ভূত হন—প্রচলিত নিয়ম-কানুনে সীমাবদ্ধ নন, দৃপ্তকণ্ঠে বক্তব্য দেন এবং সর্বদা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। ফেব্রুয়ারিতে কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে তিনি একটি লাল রঙের ধাতব চেইনসো তুলে ধরেন এবং বলেন, “এই চেইনসো আমলাতন্ত্র ধ্বংসের জন্য।”
নির্বাচনী প্রচারে মাস্ক বলেছিলেন, ডগ এর মাধ্যমে অন্তত ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ডগ প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে, যদিও রয়টার্স তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
মাস্ক শুরু থেকেই ফেডারেল কর্মীদের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, "কোভিড-পরবর্তী টেলিওয়ার্ক সুবিধা" বাতিল করলে "স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার ঢল নামবে", যা তাঁরা স্বাগত জানাবেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, তাঁর কিছু কৌশল নিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মার্চ মাসে ট্রাম্প নিজেই স্মরণ করিয়ে দেন যে, নিয়োগ ও বরখাস্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিবদের হাতেই থাকবে, মাস্কের নয়।
মাস্ক পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিও, পরিবহন সচিব শন ডাফি, এবং অর্থ সচিব স্কট বেসেন্ট-এর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো-কে তিনি বলেন, “মূর্খ এবং ইটের বস্তার চেয়েও বোকা।” নাভারো এই মন্তব্য উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আমাকে এর চেয়েও খারাপ বলা হয়েছে।”
একই সময়ে মাস্ক ইঙ্গিত দিতে থাকেন যে, তাঁর সরকারি দায়িত্ব শিগগিরই শেষ হতে চলেছে। এপ্রিলের ২২ তারিখে টেসলার এক কনফারেন্স কলে তিনি বলেন, তিনি সরকারি কাজ অনেকটা কমিয়ে ব্যবসা খাতে বেশি মনোযোগ দেবেন।
ওয়াশিংটন পোস্টকে মাস্ক বলেন, “ফেডারেল আমলাতন্ত্রের অবস্থা আমার ধারণার চেয়েও খারাপ। সমস্যা আছে জানতাম, তবে কিছু উন্নতি আনতে এতটা চড়াই যুদ্ধ হতে হবে ভাবিনি।”
ট্রাম্প প্রশাসনে মাস্কের ১৩০ দিনের বিশেষ সরকারি কর্মচারী হিসেবে মেয়াদ ৩০ মে নাগাদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রশাসন জানিয়েছে, ফেডারেল সরকারকে পুনর্গঠন ও সংকোচনের জন্য ডগ-এর কার্যক্রম চলবে।
কিছু মন্ত্রিসভা সদস্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন কিভাবে ডগ ধরে রেখে কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের বিরক্ত না করে সামনের দিকে এগোনো যায়। অনেকেই ডগ-এর কাঠামোর কিছু অংশ রাখার পক্ষে হলেও তারা বাজেট ও জনবল নিয়ন্ত্রণে নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে চান।
মাস্ক বলেন, “ডগ-এর লক্ষ্য সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হবে এবং এটি সরকারের প্রতিটি স্তরে একটি স্বাভাবিক চর্চা হয়ে উঠবে।”
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ও ডগ প্রায় ১২% বা ২ লাখ ৬০ হাজার ফেডারেল কর্মী ছাঁটাই করেছেন, যা মোট কর্মীর (২.৩ মিলিয়ন) একটি বড় অংশ। এই ছাঁটাই হয়েছে মূলত বরখাস্তের হুমকি, স্বেচ্ছায় অবসর বা বাইআউটের মাধ্যমে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখেও পড়েছে ডগ। অনেক সময় আদালতের আদেশে বাতিল হওয়া সংস্থা পুনরায় চালু হয়েছে। আবার কিছু সংস্থার বাজেট ও জনবল কমিয়ে দেওয়ায় কেনাকাটায় বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীদের হারাতে হয়েছে।
সর্বশেষ বিরোধ দেখা দেয় মঙ্গলবার, যখন মাস্ক রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত কর ও বাজেট বিলের ব্যয় নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি সিবিএস নিউজকে বলেন, “এই বিশাল ব্যয়বহুল বিল দেখে আমি হতাশ হয়েছি, যা বাজেট ঘাটতি কমানোর বদলে বাড়িয়ে দেয় এবং ডগ-এর কাজকে বাধাগ্রস্ত করে।”
এক সূত্র জানায়, টেলিভিশনে ট্রাম্পের বিলের বিরুদ্ধে মাস্কের মন্তব্য হোয়াইট হাউসের শীর্ষ সহকারীদের বেশ চটে দেয়।
তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে এবং কিছু বিনিয়োগকারী চান তিনি ট্রাম্পের উপদেষ্টা পদ ছেড়ে টেসলার ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিন, যেটির বিক্রি এবং শেয়ারের দাম কমে গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মাস্ক বলেছেন, তিনি একজন নির্বাচিত কর্মকর্তা না হয়েও ট্রাম্পের কাছ থেকে অভূতপূর্ব ক্ষমতা পেয়েছিলেন ফেডারেল সরকার সংস্কারে। গত বছর ট্রাম্পের প্রচারণায় এবং অন্যান্য রিপাবলিকানদের পেছনে মাস্ক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। তবে এই মাসের শুরুর দিকে তিনি বলেন, তাঁর রাজনৈতিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তিনি কাতারে এক অর্থনৈতিক ফোরামে বলেন, “আমার মনে হয়, আমি যথেষ্ট করেছি।”
সূত্র: রয়টার্স