মিরাজ
তায়েফ
থেকে ফেরার পর এক রাত্রে
আল্লাহর হুকুমে জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কা'বা থেকে
মসজিদুল আকসায় নিয়ে গেলেন বুরাক নামের এক বাহনে করে।
সেখানে তিনি সকল নবীদের ইমাম হিসাবে দু'রাকাত সালাত
আদায় করেন। তারপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় আসমানে উপরে। প্রতি আসমানে বিভিন্ন নবী রাসূলের সাথে তাঁর দেখা হয়। তারপর তাঁকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে মুহাম্মাদের উম্মাতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে দেওয়া হয়। তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো
হয়।
এমন
এক সময় এ ঘটনাটি ঘটে
যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক চাচা আবু তালিব মারা গিয়েছেন এবং তার স্ত্রী খাদিজা মারা গিয়েছেন, মক্কাবাসীর অত্যাচার চরমে পৌঁছেছে। তায়েফবাসীর কাছেও তিনি কোনো রকম সাহায্য তো পানই না,
বরং রক্তাক্ত, অপমানিত হয়েছেন। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূলের জন্য মস্ত বড় এক অনুগ্রহ ছিল।
যা তাঁর রাসূলের অন্তরকে প্রশান্ত ও শক্তিশালী করে
তোলে।
পরদিন
সকালে ঘটনাটি শুনে অনেকেরই দ্বিধা-দ্বন্দ দেখা দিল, অনেক মুসলিমই অবিশ্বাস করে কাফির হয়ে গেল। লোকেরা আবু বকরকে জিজ্ঞাসা করল: তুমি কি শুনেছ তোমার
বন্ধু কি বলছে? সে
বলছে যে সে গতরাতে
কা'বা থেকে জেরুজালেমের
আল-আকসা মসজিদে গিয়েছে, সালাত আদায় করেছে, তারপর মক্কায় ফিরে এসেছে।
আবু
বকর বললেন: উনি যদি একথা বলে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই তা সত্য। আমি
তো এর চেয়েও আশ্চর্য
বিষয় বিশ্বাস করি যে তাঁর উপর
আল্লাহর কাছ থেকে ওহী আসে।
তারপর
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে ব্যাপারটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন যে সত্যিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ বাইতুল মুকাদ্দাস ও সেখান থেকে
নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, আবু বকর বললেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “আবু বকর, তুমি সিদ্দীক।"
এভাবেই
আবু বকর সিদ্দীক' হিসাবে খ্যাতি লাভ করলেন। নবী রাসূলদের পরেই সিদ্দীকের মর্যাদা। রাসূলুল্লাহ যদি কিছু বলে থাকেন, তবে তা সত্যি-আবু
বকরের কথা থেকে আমরা হাদীসে যাচাইয়ের এই মূলনীতিটি পাই।
হিজরত
আয়েশা
রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত সকালে বা সন্ধ্যায় তাঁদের
বাড়ীতে আসতেন। একদিন তিনি দুপুরে এলেন এমন একটা সময়ে যে বোঝা যাচ্ছিল
গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আবু বকর দরজা খুললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জানালেন যে আল্লাহ তাঁকে
মদীনায় হিজরত করার অনুমতি দিয়েছেন।
আবু
বকর জিজ্ঞাসা করলেন: আমিও কি আপনার সাথে
যেতে পারবো?
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হ্যাঁ, তুমিও যেতে পারবে। আনন্দে আবু বকর কেঁদে ফেললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হবেন এটাই ছিল তাঁর আনন্দ, অথচ হিজরতের কাজটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক, ধরা পড়লে অবধারিত মৃত্যু। আগেই আবু বকর হিজরতের জন্য দুটো উট তৈরী করে
রেখেছিলেন। এ আগে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে হিজরতের অনুমতি দেন নি, অপেক্ষা করতে বলেছিলেন।
সে
রাতেই তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন মদীনার পথে। মক্কার অদূরে সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন, সাথে ছিল আবু বকরের কন্যা আসমার বেঁধে দেওয়া কিছু খাবার।
তিনিদিন
তাঁরা ঐ গুহায় থাকলেন।
রাত্রে আবু বকরের ছেলে খাবার নিয়ে সেখানে যেতেন ও মক্কার সব
খবর দিতেন। আবু বকরের রাখাল ভেড়ার পাল চরিয়ে রাত্রে ঐ পথে ফিরতো,
পায়ের সব দাগ মুছে
দিয়ে।
কুরাইশরা এ কয়দিন চারিদিকে
তাঁদের খুঁজেছে, এক সময় তারা
গুহার খুব কাছে এসে পড়ল। এমনটি নিচের দিক তাকালেই তাঁদের দেখে ফেলতো। আৰু বকর চিন্তায় অস্থির হয়ে বললেন: আমাদের কিইবা করার আছে, আমরা মাত্র দুজন।
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, তুমি ভুল বলেছ, আমরা তিনজন, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। স
ত্যিই
তারা তাঁদের খুঁজে পেল না, ফিরে গেল। কুরআনে সূরা তওবার ৪০ নম্বর আয়াতে
এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে আল্লাহ আবু বকরকে সাহিবা সাথী হিসাবে বর্ণনা করেছেন, বলেছেন যে তিনি হচ্ছেন
'দুজনের দ্বিতীয়'।
এরপর
তাঁরা একজন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক নিয়ে যাত্রা করলেন মদীনার পথে। পথে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে আবু বকর বলেছেন: ইনি আমর পথ প্রদর্শক। তাঁর
এ কথায় কোনো ভুল ছিল না, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সকলের। দুনিয়া ও আখিরাতের পথ
প্রদর্শক।
হিজরতের
দিনগুলোতে আবু বকর ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে আবু বকরের দ্বীনের জ্ঞান ও বুঝ সকলের
চেয়ে বেশি ও পূর্ণ হওয়ার
কারণ এটাই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাঃ মের জীবদ্দশায় সালাতের ইমামতি
মৃত্যুর
পূর্বে চরম অসুস্থতার সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাতের ইমামতি করতে পারেন নি, তখন তাঁর নির্দেশে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জামাতে সালাতের ইমামতি করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরের সময়
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর সংবাদে সাহাবীগণ গভীর দুঃখ ও শোকে আচ্ছন্ন
হয়ে পড়েন।
ওসমান
রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘরে ছিলেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু জানাযার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খোলা তলোয়ার নিয়ে ঘুরছিলেন, বলছিলেন: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা যান । তিনি মুসার
আলাইহিস সালামের মত তাঁর রবের
কাছে গিয়েছেন এবং আবার ফিরে আসবেন। যারা তাঁকে মৃত বলবে, ফিরে এসে তিনি তাদের সবাইকে হত্যা করবেন।
কেউ
কেউ মসজিদে বসে কাঁদছিলেন। মৃত্যুর খবর শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এলেন। তাঁর মুখের চাদর সরিয়ে কপালে চুমু দিলেন। বললেন: জীবনে এবং মৃত্যুতে আপনি অনুগ্রহপ্রাপ্ত। তারপর বাইরে এসে সব দেখে-শুনে
সমবেত লোকদের বললেন: যদি কেউ মুহাম্মাদের ইবাদত করে থাক, তবে জেনে রাখ মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যে লোক
আল্লাহর ইবাদত করে সে যেন জেনে
রাখে যে আল্লাহ চিরঞ্জীব,
তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।
তারপর
তিনি সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন:
وَ مَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ
قَبۡلِهِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ انۡقَلَبۡتُمۡ عَلٰۤی اَعۡقَابِکُمۡ
ؕ وَ مَنۡ یَّنۡقَلِبۡ عَلٰی عَقِبَیۡهِ فَلَنۡ یَّضُرَّ اللّٰهَ شَیۡئًا ؕ وَ سَیَجۡزِی
اللّٰهُ الشّٰکِرِیۡنَ ﴿۱۴۴﴾
"যদি
রাসূলুল্লাহ নিহত হয় বা মারা যায়,
তাহলে তোমরা কি উল্টাপায়ে ফিরে
যাবে?" [সূরা আল-বাকারা: ১৪৪]
|
লোকেরা
তাঁর কথায় সম্বিত ফিরে পেল। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহ বলেছেন: আমি যখন আয়াতটি শুনলাম, হাঁটু ভেঙ্গে আমি মাটিতে বসে পড়লাম। আমি বুঝতে পারলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সত্যিই মারা গেছেন।
এভাবেই
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর মত বিরাট একটি
ঘটনার যে সংকট দেখা
দিয়েছিল, আবু বকরের দৃঢ়তায় তার পরিসমাপ্তি ঘটে।
খিলাফত
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পর তাঁর দাফন
শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী খলিফা নির্বাচন নিয়ে সমস্যা দেখা দিল। মদীনার আনসাররা সাকীফা বনু সায়িদায় একত্রিত হন। সেখানে কিছু সংখ্যক মুহাজির ও ছিলেন। আনসাররা
অভিমত দিলেন যে পরবর্তী খলিফা
তাঁদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হোক। মুহাজিররা এর প্রতিবাদ জানালেন।
দু পক্ষ থেকে দুজন খলিফা নির্বাচনের দাবীও কেউ কেউ জানালেন। এভাবে একটি গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হল।
খবর
পেয়ে আবু বকর, উমর ও আরো কয়েকজন
মুহাজির সেখানে গেলেন। আবু বকর একটি চমৎকার ভাষণ দিলেন। তাঁর ধীরতা ও যুক্তি- প্রমাণের
কাছে সবাই নতি স্বীকার করল।
ওমর
রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হিসাবে আবু বকরের নাম প্রস্তাব করলেন ও প্রথমেই তাঁর
হাতে বাইয়াত নিলেন। এরপর সকলেই বাইয়াত নিলেন। এভাবে ইসলামের প্রথম খলিফা নির্বাচিত হলেন আবু বকর।
এরপর
তিনি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন, যাতে একজন খলিফার দায়িত্ব এবং জনগণের দায়িত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুঠে উঠেছে।
ভাষণ: হে লোকসকল, আমাকে
তোমাদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমি তোমাদের সর্বোত্তম নই। সুতরাং যদি আমি সঠিক কাজ করি তবে আমাকে সাহায্য কর এবং যদি
আমি ভুল করি তবে আমাকে সংশোধন করে দিও। সততা একটি পবিত্র আমানত এবং মিথ্যা হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের দুর্বলরা ততক্ষণ পর্যন্ত সবল যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে তার অধিকার আদায় করে দেই ইনশাআল্লাহ এবং তোমাদের শক্তিশালীরা ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্বল যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তাদের কাছে থেকে পাওনা আদায় করে দেই ইনশাআল্লাহ। কোনো জাতি জিহাদ ত্যাগ করলে আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত না করে ছাড়বেন
না। না কোনো জাতির
মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়বে আর আল্লাহ তাকে
পরীক্ষায় ফেলবেন না। আমাকে ততক্ষণ মেনে চল যতক্ষণ আমি
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে
মেনে চলি এবং যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে
মেনে না চলি, তাহলে
আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্যের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। সালাতের জন্য দাঁড়াও। আল্লাহ তোমাদের উপর রহম করুন। (আনাস ইবন মালিক বর্ণিত)।
আবু
বকর খলিফা হওয়ার আগে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বে ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। একজন নবীর নেতৃত্ব ও মানুষের নেতৃত্বের
মাঝে পার্থক্য আছে। নবীর প্রদর্শিত পথে একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে নেতৃত্ব দেবে তা দেখিয়ে গেছেন
আবু বকর। যে সব মূলনীতি
তাঁর ভাষণের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে, তা উম্মাহর জন্য
অনুসরণীয়।
আবু
বকর স্পষ্টতই বুঝিয়ে দিলেন যে শরীয়তের উৎস
কুরআন ও সুন্নাহ। আনুগত্য
ততক্ষণ, যতক্ষণ কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
আনুগত্য করবে।
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত, কারণ আল্লাহ নিজে তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন ও সংশোধন করেছেন।
মুসলিম নেতা জবাবদিহি করবে উম্মাহর কাছে- উম্মাহর দায়িত্ব ইমামকে সঠিক পথে চালানো। সুবিচার ও সমতা হবে
ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি। নেতা ও উম্মাহর মাঝে
সম্পর্ক হবে সততা ও বিশ্বস্ততার। যে
জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ করে না, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেন এটাই আল্লাহর নিয়ম বা রীতি।
যে
জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অম্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়, সে জাতি হয়
দুর্বল।