জনগণের প্রয়োজন ও চাহিদার ভিত্তিতে সংবিধানে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন বা সংশোধন আনা যেতে পারে। তবে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানকে কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন। তাঁর অভিযোগ, একটি অশুভ শক্তি সংবিধান নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণফোরাম আয়োজিত সংবিধান দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। তাঁর পক্ষে বক্তব্য পাঠ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান। ড. কামাল হোসেন বলেন, সংবিধানে নির্ধারিত রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকার কোনো অবস্থাতেই কেড়ে নেওয়া যাবে না। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সংবিধান এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ।
তিনি আরও বলেন, শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদে সেই আদর্শের প্রতিফলন রয়েছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রবীণ এই আইনজীবী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং লাখ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি। এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে দেশ ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিরোধী দল ৩৪টি সংসদীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে নাম দিলেও সংবিধান সংশোধন কমিটিতে কেন অংশ নিচ্ছে না। তাঁর মতে, সংসদীয় আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া বিরোধী দলের দায়িত্ব। সভায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সংস্কারের প্রাথমিক লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণসহ যেসব সংস্কারের দাবি উঠেছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে সাংসদ অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, সংবিধানের যেকোনো সংশোধন ১৯৭২ সালের সংবিধানের কাঠামোর ভিত্তিতেই করতে হবে। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক আবদুর রউফও মূল সংবিধান বাতিলের বিরোধিতা করেন। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি মতৈক্য কমিশনে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় সংবিধানের মূলনীতি, সংস্কার এবং জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বক্তারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।