ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠান গঠন করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব মামলায় মোট ১ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৪ হাজার ৭৫৪ টাকা ৯০ পয়সা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকঋণ গ্রহণ করে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগে মামলাগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মামলায় যথাক্রমে ২২, ২২ ও ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৬৯ জন। তবে কয়েকজনের নাম একাধিক মামলায় রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ভুয়া অ্যাকোমোডেশন বিল তৈরি করে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করা হয়। বিভিন্ন কৌশলে এসব অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের অনুমোদিত মামলার তথ্য অনুযায়ী, তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ১২১ কোটি টাকার বেশি।
তিন প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক মামলা
দুদকের প্রথম মামলাটি করা হচ্ছে স্পিংফুল অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে ১৪১ কোটি ২৮ লাখ ১ হাজার ১৭১ টাকা ২৫ পয়সা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে। এ মামলায় সালমান এফ রহমানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলাটি আরবান ফ্যাশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির নামে ৪১৭ কোটি ৪ লাখ ৪ হাজার ৫৬ টাকা ৫ পয়সা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলাতেও সালমান এফ রহমানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে মিডওয়েস্ট গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ৫৬৩ কোটি ১৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫২৭ টাকা ৬০ পয়সা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে তৃতীয় মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে সালমান এফ রহমানসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
যেভাবে আত্মসাতের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণসুবিধা দেওয়া হয়। পরে আমদানি ও রপ্তানির নামে ভুয়া অ্যাকোমোডেশন বিল প্রস্তুত করে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রকৃত কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছাড়াই নিজেদের মধ্যে আমদানি-রপ্তানির লেনদেন হয়েছে—এমন কৃত্রিম নথি তৈরি করা হয়। এসব ভুয়া বিলের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থ স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তা বিদেশে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও পারস্পরিক যোগসাজশের বিষয়টিও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকের অনুমোদিত মামলাগুলোতে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭(ক) ও ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫)-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অপরাধের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।