কাওরান বাজারে চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক যুবকের হাতে পরপর ১১টি থাপ্পড় খাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। প্রথমে ঘটনাটি দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন, সত্যিকারের এক চাঁদাবাজকে শাস্তি দিচ্ছেন সাহসী এক প্রতিবাদী। কিন্তু পরে জানা গেল, চাঁদাবাজ, দোকানদার ও প্রতিবাদী—সব চরিত্রই ছিল অভিনয়ের অংশ। তাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে ভিউ আর অর্থ উপার্জনের এই প্রবণতা আমাদের সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
ঘটনাটির দৃশ্য ছিল বেশ নাটকীয়। টিয়া রঙের কোটি পরা এক যুবক সবজি বিক্রেতার কাছে চাঁদা দাবি করছেন, টাকা না দিলে দোকান উঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, এমনকি দোকানদারকে চড়ও মারছেন। এরপর আরেক যুবক এসে প্রতিবাদ করেন এবং অভিযুক্ত চাঁদাবাজকে পরপর ১১টি থাপ্পড় দেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় প্রশংসা, ক্ষোভ ও নানা মন্তব্য। কেউ প্রতিবাদী যুবকের সাহসের প্রশংসা করেন, আবার কেউ দাবি করেন, শাস্তি আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু পরে জানা যায়, পুরো ঘটনাটিই ছিল সাজানো অভিনয়। অর্থাৎ, যে অন্যায়ের দৃশ্য দেখে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছেন, যে প্রতিবাদ দেখে অনেকে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, সেই ঘটনাই বাস্তব ছিল না। বাস্তব ছিল শুধু দর্শকের আবেগ, আর সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে জনপ্রিয়তা ও আয় করার সম্ভাবনা। অভিনয় করে আয় করা অবশ্যই অপরাধ নয়। সিনেমা বা নাটকে কেউ চোর, ডাকাত কিংবা চাঁদাবাজের চরিত্রে অভিনয় করতেই পারেন। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অভিনয়কে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা হয়। দর্শক যদি জানেনই না যে দৃশ্যটি সাজানো, তাহলে সেটি নিছক বিনোদন থাকে না; বরং বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি তৈরি করে। এই ধরনের ভিডিওর জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি কিংবা অন্যায়ের খবর শুনলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। বিচার না পাওয়ার হতাশা থেকে অনেকে তাৎক্ষণিক শাস্তির দৃশ্য দেখে তৃপ্তি অনুভব করেন। ভিডিও নির্মাতারা সেই আবেগকেই কাজে লাগান। শুরুতেই একটি উত্তেজক ঘটনা, এরপর কয়েকটি সংলাপ, মারধরের দৃশ্য এবং শেষে নাটকীয় সমাপ্তি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন কনটেন্ট, যা মানুষকে থামিয়ে দেখতে এবং মন্তব্য করতে উৎসাহিত করে।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সাজানো ঘটনাকে বাস্তব হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন কী? চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন অভিযোগের তদন্ত, আইনের প্রয়োগ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ। অথচ এসবের পরিবর্তে যদি কেবল মারধরের দৃশ্য তৈরি করে জনপ্রিয়তা অর্জনই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বাস্তব সমস্যার সমাধান আড়ালেই থেকে যায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের ভিডিওতে অনেক সময় দোকানদার, রিকশাচালক কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে ব্যবহার করা হয়। তাঁদের অপমান বা অসহায়ত্বকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য তৈরি করা হলে সামাজিক বিদ্বেষ ও ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া কিংবা কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
দর্শকদের ভূমিকাও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ভিডিও দেখেই অভিযুক্তকে অপরাধী ঘোষণা করেন, শাস্তির দাবি তোলেন, এমনকি আরও মারধরের আহ্বান জানান। অথচ ভিডিওটি সত্যি কি না, ঘটনা সাজানো কি না, কিংবা অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ আছে কি না—সেসব যাচাই করার কথা অনেকেই ভাবেন না। বাস্তব জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রমাণ, তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখেই অনেকে রায় দিয়ে বসেন। এই প্রবণতা যেমন ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি মানুষের বিচারবোধকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় উত্তেজক কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্ল্যাটফরমে মানুষের মনোযোগের মূল্য থাকলেও, সেই মনোযোগ অর্জনের জন্য দর্শককে বিভ্রান্ত করা বা কারও মর্যাদাকে পুঁজি করা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। নির্মাতাদের যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি দর্শকদেরও কোনো ভিডিও বিশ্বাস বা ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কি কেবল ক্যামেরার সামনে কয়েকটি থাপ্পড়, নাকি সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, সচেতনতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা? সাজানো ভিডিও সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে চাঁদাবাজি বা দুর্নীতির মতো বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় না। তাই কোনো ভিডিও দেখে আবেগে ভেসে যাওয়ার আগে সত্যতা যাচাই করা এবং অভিনীত প্রতিবাদকে বাস্তব ন্যায়বিচারের বিকল্প না ভাবাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।