সরকারের অনুমতি পেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে—পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি এ বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এ ধরনের মন্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি করে।
টিআইবির মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করার পরিবর্তে ক্রসফায়ারকে সমাধান হিসেবে তুলে ধরা আইনের শাসনের জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। সংস্থাটি আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার এবং তাঁর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে টিআইবি। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে পুলিশপ্রধান ক্রসফায়ারের মতো বিতর্কিত পদ্ধতির আশ্রয় নিতে চাইছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাঁর মতে, সরকারের অনুমতির শর্ত যুক্ত করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার ইঙ্গিতও দিতে পারে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, পেশাদার তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা পুলিশের পেশাগত সক্ষমতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। তিনি উল্লেখ করেন, কোনো সরকারের অনুমোদনই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত রয়েছে। নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার বাতিল করা সম্ভব নয়। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে হত্যা করার অধিকার পুলিশের নেই।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের ভাষ্য, পুলিশপ্রধানের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য মাঠপর্যায়ে আইনবহির্ভূত বলপ্রয়োগের পরোক্ষ অনুমোদন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যে কর্মকর্তার দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীকে আইন ও বিধিবিধানের মধ্যে পরিচালনা করা, তাঁর মুখে ক্রসফায়ারের মতো পদ্ধতির কথা শোনা নেতৃত্বের যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, পুলিশের যেকোনো ধরনের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য একান্ত অপরিহার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এ সীমিত ব্যতিক্রমকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগের বিষয়টিও বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরেছে টিআইবি। সংস্থাটির বক্তব্য, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু ঢালাও অভিযোগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের বক্তব্য স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে নিরুৎসাহিত করার আশঙ্কা তৈরি করে।
সব মিলিয়ে, পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা, প্রত্যাহার এবং যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আইনের শাসন ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।