মানুষের একটি দৃষ্টি বদলে দিতে পারে তার চিন্তা, চরিত্র ও জীবনের গতিপথ। মহান আল্লাহর দেওয়া চোখ যেমন পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখার অমূল্য নিয়ামত, তেমনি এই চোখের অসংযত ব্যবহার মানুষকে পাপের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের কারণে দৃষ্টিকে সংযত রাখা হয়ে উঠেছে বড় এক চ্যালেঞ্জ। তাহলে কীভাবে নিজের দৃষ্টিকে হেফাজত করবেন এবং রক্ষা করবেন আত্মিক পবিত্রতা?
ইসলামে দৃষ্টি সংযত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা নুরের ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পরের আয়াতেই মুমিন নারীদেরও একইভাবে দৃষ্টি সংযত রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, দৃষ্টির সংযম শুধু পুরুষের জন্য নয়, নারী-পুরুষ সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের চোখ, মন ও আচরণের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি অনেক সময় মনে কুপ্রবৃত্তি সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী সময়ে মানুষকে অনৈতিক কাজের দিকে প্ররোচিত করতে পারে।
হাদিসেও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে কামনাপূর্ণ দৃষ্টিকে চোখের জিনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি লালসাপূর্ণ দৃষ্টি মানুষের নৈতিক ও আত্মিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই নিজের দৃষ্টির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমান সময়ে এই দায়িত্ব পালন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ছবি, ভিডিও ও বিষয়বস্তু সামনে আসে। কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে, আবার কখনো নিজের আগ্রহেই মানুষ এমন কিছু দেখে, যা তার ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মনোযোগ, মানসিক প্রশান্তি এবং আত্মসংযমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু বাস্তব জীবনে নয়, অনলাইন জগতেও দৃষ্টির হেফাজত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রথম করণীয় হলো, একান্তে কিংবা সবার সামনে—সব অবস্থায় মহান আল্লাহর উপস্থিতির কথা স্মরণ রাখা। নিজের কাজ ও দৃষ্টির বিষয়ে জবাবদিহির অনুভূতি মানুষকে সংযত থাকতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, হঠাৎ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা নিষিদ্ধ দৃশ্য চোখে পড়লে দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু দেখে ফেলা আর ইচ্ছাকৃতভাবে তাকিয়ে থাকা এক বিষয় নয়। তাই ভুলবশত কোনো দৃশ্য চোখে পড়লে সেটির দিকে বারবার না তাকিয়ে নিজের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। যেসব পেজ, চ্যানেল বা ভিডিও বারবার কুপ্রবৃত্তি উসকে দেয়, সেগুলো এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে অনুসরণ বন্ধ করা যেতে পারে। পাশাপাশি অবসর সময়কে উপকারী কাজে ব্যয় করা, ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া এবং ভালো পরিবেশে থাকার অভ্যাসও আত্মসংযম গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
দৃষ্টির হেফাজত কেবল পাপ থেকে দূরে থাকার বিষয় নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সুন্দর চরিত্র গঠন এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সুস্থতা বজায় রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। চোখ আল্লাহর দেওয়া অমূল্য নিয়ামত। সেই নিয়ামতকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং নিজের দৃষ্টি ও আচরণে সংযম বজায় রাখাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। আসুন, অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির অভ্যাস থেকে নিজেদের রক্ষা করি, অনলাইন ও বাস্তব জীবনে সচেতন থাকি এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে চলি।