দেশের তিন লাখেরও বেশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য আসছে সরকারি সম্মানীর ব্যবস্থা! আগামী চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের ধর্মীয় নেতাদের এই কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, আর সমাজ গঠন ও মাদকবিরোধী সচেতনতায় ইমামদের কী ভূমিকা দেখতে চায় সরকার?
শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও জাতীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব বিষয়ে কথা বলেন ধর্মমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ইমাম সমাজের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করতে এ ধরনের সম্মেলন অর্থবহ ভূমিকা রাখে।
ধর্মমন্ত্রী আরও বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মসজিদ ছিল সমাজ সংস্কার, নৈতিক শিক্ষা ও মানবকল্যাণের অন্যতম কেন্দ্র। সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করে দেশের প্রতিটি মসজিদকে হেদায়েত ও সমাজ উন্নয়নের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। তাঁর মতে, মাদক, হিংসা-বিদ্বেষ এবং সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে জুমার খুতবা ও ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরিতে ইমামরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ, ধর্মীয় নেতা হিসেবে তাঁদের বক্তব্যের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। এই আস্থাকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
ধর্মমন্ত্রী বলেন, সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং উসকানিমূলক পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে আলেম-ওলামা ও ইমামদের দায়িত্ব রয়েছে। প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও সুন্দর ভাষার মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সম্মেলনে ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। তিনি জানান, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন খাতে এক হাজার একশ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের মোট তিন লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় নেতাদের আগামী চার বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সরকারি সম্মানী কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও ইমামদের যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইমাম সমাজের পরামর্শ ও সুপারিশগুলো ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলেও জানান তিনি। বক্তব্যে ধর্মমন্ত্রী ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের কল্যাণে দুই কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণার কথাও স্মরণ করেন। এ সময় তিনি প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া চান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্যও দোয়া করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক ও বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীন বলেন, মাদক, সন্ত্রাস ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ইমামদের জুমার আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে মানুষকে নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয়ে সচেতন করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হোরায়রা স্বাগত বক্তব্য দেন। সভাপতিত্ব করেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জামাল। এ ছাড়া ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এখন এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আগামী চার বছরে সরকারি সম্মানী দেওয়ার উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং দেশের ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঘোষণা বাস্তবে রূপ নিলে ধর্মীয় সেবায় নিয়োজিত বহু মানুষের জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে।