বাংলাদেশে মাদক পাচারের চিত্রে সামনে আসছে নতুন উদ্বেগজনক তথ্য। সড়কপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় এবার পাচারকারীদের একটি অংশ নৌপথকে ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মিয়ানমার থেকে নৌযানে করে দেশে ঢুকছে ইয়াবার চালান, আর সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে বরিশাল, চাঁদপুর, মোংলা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রশ্ন উঠছে, নজরদারির বাইরে থেকে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ মাদক দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে?
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগে সড়কপথে মাদক পাচারের প্রবণতা বেশি থাকলেও এখন নৌপথে পাচারের ঘটনা বাড়ছে। সড়কে পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তল্লাশি এবং নজরদারি জোরদার হওয়ায় পাচারকারীরা বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানেও নৌপথে মাদক পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। মিয়ানমার থেকে কীভাবে মাদকের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, কোন কোন নৌপথ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং দেশের কোথায় কোথায় এসব চালান পৌঁছাচ্ছে, তা শনাক্তের কাজ চলছে। এ ছাড়া পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত মাদকগুলোর মধ্যে ইয়াবার বিস্তার উল্লেখযোগ্য।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে ট্রলারসহ নানা ধরনের নৌযানে মাদকের চালান দেশে আনা হচ্ছে। পরে বরিশাল, চাঁদপুর ও মোংলাসহ বিভিন্ন এলাকার মধ্য দিয়ে এসব মাদক দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাঁচ লাখ ইয়াবার দুটি চালান এবং তিন লাখ ইয়াবার আরেকটি চালান আটক করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা নৌপথে মাদক পাচারের ব্যাপকতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে, টেকনাফ থেকে নৌপথে আসা মাদকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে চাঁদপুরের নাম উঠে এসেছে। সেখানে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ২৫ হাজার ইয়াবাসহ ওই এলাকার রানা নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, সারা দেশে মাদকের বিস্তারের তুলনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জনবল ও সক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। জনবল এবং অবকাঠামো বাড়ানোর প্রস্তাব একাধিকবার দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, নৌপথে মাদক পাচার ঠেকাতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ান, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ানের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী নৌপথে মাদক প্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি নিয়ে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নৌপথে নজরদারি বাড়ানো, পাচারকারী চক্র শনাক্ত করা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ, সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদকের চালান দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই আটকানো না গেলে তা নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে।