বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের পর্দায় একসময় যাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন দর্শক, সেই প্রবীণ অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। রোববার, ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার লুবানা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নাসিমা খান। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সনি রহমান তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
সনি রহমান জানান, নাসিমা খান বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। প্রায় এক সপ্তাহ আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে উত্তরার লুবানা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাসিমা খান। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রহমান, গোলাম মুস্তাফা ও আজিমের মতো খ্যাতিমান অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। শুধু ঢাকার চলচ্চিত্রেই নয়, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরের চলচ্চিত্র অঙ্গনেও নিজের অভিনয়দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি।
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন নাসিমা খান। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই ছোটবেলায় সংস্কৃতি ও শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর ১৯৬১ সালে ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পরিচিতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এই অভিনেত্রী।
তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’। লাহোরে নির্মিত ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’, ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’, ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ এবং ‘রোড টু সোয়াত’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন তিনি। এর মধ্যে ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ চলচ্চিত্রের প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন নাসিমা খান।
স্বাধীনতার পর একসময় রুপালি পর্দা থেকে দূরে সরে গেলেও পরে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে আবারও দর্শকদের সামনে ফিরে আসেন তিনি। এরপর বিভিন্ন নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এটিই ছিল তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্রে অভিনয়।
নাসিমা খানের মৃত্যুতে স্মৃতিচারণ করেছেন অভিনেতা ওমর সানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি প্রবীণ এই শিল্পীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ওমর সানি জানান, নাসিমা খান ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াকে নিজের সৌভাগ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বাংলা ও উর্দু—দুই চলচ্চিত্র অঙ্গনেই অবদান রেখেছেন নাসিমা খান। তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্রের পুরোনো দিনের স্মৃতিবিজড়িত এক পরিচিত মুখকে হারালেন দর্শক ও সহকর্মীরা।