একদিকে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার, অন্যদিকে সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের মানবাধিকার ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন—এই দুই বিষয় নিয়েই ২০১৩ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের প্রতি উদ্বেগ জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে, বিপুলসংখ্যক আসামির বিচার, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের সদর দপ্তরে বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে ৭৪ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। এই ঘটনার বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ছিল গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তবে অপরাধের বিচার করতে গিয়ে অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন নাভি পিল্লাই।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর পিলখানা হত্যা মামলায় বিশেষ আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর পরদিন, ৬ নভেম্বর, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। বিপুলসংখ্যক আসামিকে একসঙ্গে বিচারের মুখোমুখি করা, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কয়েকজন আসামির হেফাজতে মৃত্যুর খবর এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা প্রমাণ আদালতে ব্যবহারের অভিযোগও তাঁর উদ্বেগের বিষয় ছিল।
নাভি পিল্লাই এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, তদন্তের ফল প্রকাশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে সেই বিচার হতে হবে ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শুধু পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও সে সময় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে এসব অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচার না হওয়া অপরাধগুলোর বিচার বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রতিরক্ষা পক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের একটি যোগাযোগে আবদুল কালাম আজাদের অনুপস্থিতিতে বিচার, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর পর্যাপ্ততা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উত্থাপিত অভিযোগ ও উদ্বেগ, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এখানে মনে রাখা জরুরি, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ছিল পৃথক ঘটনা ও স্বতন্ত্র বিচারপ্রক্রিয়া। নাভি পিল্লাইয়ের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নির্দিষ্ট মামলাগুলোর ন্যায্যতা এবং অভিযুক্তদের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। অর্থাৎ, গুরুতর অপরাধের বিচার হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বাধ্যবাধকতা মানা প্রয়োজন—এ কথাই গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভি পিল্লাই ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এই মানবাধিকারকর্মী।
সম্প্রতি তাঁর নামে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবর সামনে আসার পর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পুরোনো বক্তব্য আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে নির্দিষ্ট সময়, ঘটনা ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি। কারণ, তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলো ছিল মূলত ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা, নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত এবং অভিযুক্তদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে।