নির্বাচনের সময় আলেমদের কাছে টানা হবে, ব্যবহার করা হবে রাজনৈতিক স্বার্থে—আর নির্বাচন শেষ হলেই তাঁদের গুরুত্ব কমে যাবে। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আলেম-ওলামাদের নিজেদের নীতি, শক্তি ও অবস্থানের ভিত্তিতে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, অন্যের রাজনৈতিক খেলার গুটি হয়ে থাকা নয়, বরং নিজেদের খেলার চালক হতে হবে আলেমদের। একই সঙ্গে ধর্মীয় সহনশীলতা, গবেষণা এবং নিজস্ব গণমাধ্যম গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
গত শুক্রবার, ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চলমান ইসলামি বইমেলার মঞ্চে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও তাঁর পরবর্তী আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণে এনসিপির সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের প্রকাশিত ‘তুরাস’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা ‘উত্তরাধিকার, পর্ব–১’-এর মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, অতীতে নির্বাচনের সময় স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো টুপি-পাঞ্জাবি পরে বিভিন্ন মাদরাসায় গিয়ে আলেমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখাত। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে আলেম সমাজকে প্রান্তিক ও অনগ্রসর হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে আলেমদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও সক্ষমতা তৈরি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিগত সরকারের সময়ে আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাসনাত বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এসব ঘটনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য একাডেমিক গবেষণা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে ওলামা অ্যালায়েন্সের প্রকাশিত ‘তুরাস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাও তুলে ধরেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের বক্তব্য সংগ্রহ করে অনেক আগেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক মানের নথিপত্র তৈরি করা উচিত ছিল। এদিকে, দেশের অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গেও কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে অন্য ধর্মের মানুষ বাংলাদেশে অনিরাপদ হয়ে পড়বেন—এমন প্রচারকে ভুল প্রমাণে আলেমদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় পাহারা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, ওই সময় আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষের ভূমিকার মাধ্যমে অন্য ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ ধরনের দায়িত্ব শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অব্যাহত রাখতে হবে বলে আহ্বান জানান তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, মাদরাসাশিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম-ওলামাদের উগ্রবাদী কিংবা অসহিষ্ণু হিসেবে উপস্থাপনের যে প্রবণতা রয়েছে, তা ভুল প্রমাণ করার দায়িত্ব তাঁদের নিজেদেরই নিতে হবে। অন্য ধর্মের মানুষেরা যেন তাঁদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। আসন্ন দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সামনে পূজাসহ বিভিন্ন ধর্মের সাংস্কৃতিক আয়োজন রয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখতে আলেমদের আগের মতোই দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে।
ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে বিতর্ক ও মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন অসহিষ্ণুতা বা বিদ্বেষে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, আলেমদের বিরুদ্ধে পরমতসহিষ্ণুতার অভাবের অভিযোগ যাতে প্রতিষ্ঠা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে নিজেদের আচরণ ও কাজের মাধ্যমে। এ জন্য নিজস্ব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানে বক্তব্য শেষে হাসনাত আবদুল্লাহসহ এনসিপি ও ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের নেতারা ‘তুরাস’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন।