রেলওয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই কক্সবাজারগামী দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্যকার আশফাক নিপুণ। টিকিট কালোবাজারি ও দীর্ঘদিনের অদৃশ্য সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনাটিকে তিনি ‘কমার্স ফিকশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বুধবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন আশফাক নিপুণ। তিনি জানান, আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তার বয়োবৃদ্ধ সেজো মামা। বয়সের কারণে দীর্ঘ সময় বাসে বসে ভ্রমণ করা তার জন্য কষ্টকর হওয়ায় তারা রেলপথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
নির্মাতা জানান, যাত্রার প্রায় ১০ দিন আগে সকাল ৮টায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটের টিকিট ছাড়ার কথা জানতে পেরে তিনি সকাল পৌনে ৮টা থেকেই মোবাইল ফোন হাতে প্রস্তুত ছিলেন। টিকিট কাটার সময় কোনো ধরনের নোটিফিকেশন বা অন্য কোনো সমস্যায় যেন বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতাও নিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘড়ির কাঁটা সকাল ৮টা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি টিকিটের খোঁজে সার্চ করেন। তখন পর্দায় একাধিক খালি আসন দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু টিকিট কাটার প্রক্রিয়া শুরু করার মাত্র এক মিনিট পর, অর্থাৎ সকাল ৮টা ১ মিনিটের মধ্যেই দেখতে পান—দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে গেছে।
এই ঘটনাকে অবিশ্বাস্য উল্লেখ করে আশফাক নিপুণ প্রশ্ন তোলেন, একটি টিকিট নির্বাচন করা, যাচাইকরণ কোড দেওয়া, অর্থ পরিশোধ এবং লেনদেন নিশ্চিত করার মতো পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই যেখানে কয়েক মিনিট সময় প্রয়োজন, সেখানে মাত্র এক মিনিটে দুটি ট্রেনের সব আসন কীভাবে বিক্রি হয়ে গেল। তিনি আরও বলেন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও স্বাভাবিকভাবে এত অল্প সময়ে একটি ট্রেনের বিপুলসংখ্যক টিকিট বিক্রি হওয়া নিয়েই প্রশ্ন থাকে। সেখানে মাত্র এক মিনিটে দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়াকে তিনি ব্যঙ্গ করে ‘এক মিনিটে দুই ট্রেন গায়েব’-এর মতো ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেন।
টিকিট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও করেন এই নির্মাতা। তার দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও টিকিটকেন্দ্রিক এই সিন্ডিকেটের কোনো পরিবর্তন হয় না। বিভিন্ন সময়ে সাধারণ যাত্রীদের টিকিট পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন। আশফাক নিপুণের মতে, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, রেলওয়ের টিকিট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত এই চক্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে সাধারণ মানুষের জন্য নিয়ম মেনে টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, কোনো সরকার যদি বিমানবন্দর ও রেলওয়ের দীর্ঘদিনের এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে পারে, তাহলে সেই সরকারকে তিনি নিঃসন্দেহে সর্বকালের সেরা সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত।
এদিকে রেলের অনলাইন টিকিট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা উধাও হয়ে যাওয়া এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি ইতোমধ্যে আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর সিলেটের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে মামলা করেন। পরে ১ অক্টোবর আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে দেয়। বর্তমানে সংস্থাটির একজন উপপরিদর্শক মামলাটি তদন্ত করছেন। ফলে কক্সবাজারগামী দুটি ট্রেনের টিকিট মাত্র এক মিনিটে শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ নতুন করে রেলওয়ের অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনা, টিকিট কালোবাজারি এবং কথিত সিন্ডিকেট নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।