জ্বালানিসংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আর রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা—এই তিন চাপের সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ, বাড়ছে দারিদ্র্য, স্থবির কর্মসংস্থান: বিশ্বব্যাংক

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৩ সময় , আপডেট সময় : ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৩ সময়

জ্বালানিসংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আর রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা—এই তিন চাপের সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি আরও কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতির এই ধীরগতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের চাপ এবং ব্যাংক খাতের বাড়তে থাকা ঝুঁকি। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যও বাড়ছে।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতে এমন সংকোচন এই প্রথম। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। ২০২২ সালে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।


দারিদ্র্যের চিত্রও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই সীমার নিচে নেমেছে। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ীও টানা চতুর্থ বছরের মতো দারিদ্র্য বেড়েছে। ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে এই হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।


রাজস্ব আদায়েও দেখা যাচ্ছে বড় ঘাটতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন এবং অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে দ্রুত সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংক খাতে সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে তা নির্ধারণ, দুর্বল ব্যাংকের প্রকৃত লোকসান চিহ্নিত করা এবং মালিক ও বিনিয়োগকারীদেরও লোকসানের দায় বহনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।


জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার কথাও বলেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেছেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


তবে সংস্কার কার্যকর হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনাও দেখছে বিশ্বব্যাংক। জ্বালানিসংকট দূর করা এবং দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বর্তমানে সরকারের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির মাত্র ৫৪ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষ পাচ্ছেন। ফলে তুলনামূলক সচ্ছল জনগোষ্ঠীর কাছেও সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে।


বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, খাদ্যভিত্তিক একাধিক ভর্তুকি একত্রিত করা, নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও উন্নত করা এবং পারিবারিক কার্ডের সঙ্গে এসব কর্মসূচির সমন্বয় করা গেলে আরও প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ—জ্বালানি, ব্যাংকিং, রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য। বিশ্বব্যাংকের বার্তা হলো, দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি ফেরানো কঠিন হবে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯