যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—কিন্তু এবার সেই সম্পর্ক নিয়েই প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাতে শুরু করেছে ভারত। বাণিজ্যনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে

এত দিন চুপ থাকলেও হঠাৎ কেন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব মোদি সরকার

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৩ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৫৩ সময় , আপডেট সময় : ৩ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৫৩ সময়

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক—কিন্তু এবার সেই সম্পর্ক নিয়েই প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাতে শুরু করেছে ভারত। বাণিজ্যনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠতা এবং ‘সন্ত্রাসবাদ’ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে ভারতের বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নিউইয়র্কে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের একাধিক বক্তব্যে এই অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগগুলো যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে না। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে বাড়তে থাকা টানাপোড়েনের মধ্যেই নয়াদিল্লির এই কঠোর অবস্থান সামনে এসেছে।


গত ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পরে তিনি ওই আলোচনা ‘ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে আগের সময়ে ট্রাম্পকে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করা মোদির বক্তব্যের তুলনায় এবার তার প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। বাণিজ্যই এখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৯১০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৫ হাজার ৮৪০ কোটি ডলার।


নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, কোনো দেশ নিজেদের স্বার্থকে এমনভাবে প্রাধান্য দিতে পারে না, যাতে অন্য দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে কৃষি খাত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। কৃষকদের সুরক্ষার জন্য ভারত কয়েক দশক ধরে নিজেদের কৃষিপণ্য বাজারকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রেখেছে। জয়শঙ্কর জানান, বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হলেও প্রত্যাশার তুলনায় বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল।


এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শুল্কের চাপ। রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়টিও নয়াদিল্লির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে ভারতের সমালোচনা এখন আগের তুলনায় বেশি প্রকাশ্যে আসছে। তার ভাষ্য, ভারতের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।


শুধু বাণিজ্য নয়, পাকিস্তান ইস্যুও ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। গত বছরের মে মাসে ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সংঘাত হয়। এরপর যুদ্ধবিরতিতে নিজের ভূমিকার কথা বারবার তুলে ধরেন ট্রাম্প। কিন্তু কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়গুলোতে কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা নয়, দ্বিপক্ষীয় সমাধানই নয়াদিল্লির অবস্থান। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দিয়েছেন। ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের এই ঘনিষ্ঠতা ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।


জয়শঙ্কর বলেন, কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশী একটি দেশের নীতির কারণে ভারত সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়ে আসছে। ভারতের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের এই উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব বা সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ভারতের গবেষক হর্ষ পান্তের মতে, ভারতের সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পাকিস্তানকেন্দ্রিক আগ্রহ বাড়ার কারণে নয়াদিল্লি এখন মতপার্থক্যগুলো প্রকাশ্যে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করছে।


এর পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরীণ চাপও সম্পর্কের অবস্থান বদলের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি এবং এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির পরিবর্তন ভারতীয় কর্মীদের ওপরও প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত কর্মক্ষেত্রে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতীয়রা দীর্ঘদিন ধরে বড় অংশজুড়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবেদন প্রক্রিয়া ও ফি নিয়ে নানা পরিবর্তন এসেছে। জয়শঙ্করের মতে, মানুষের এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলাচলকে একসময় অর্থনৈতিক সুবিধার অংশ হিসেবে দেখা হলেও এখন এর অর্থনীতি ও রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। ভারতের বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসনের মতো বিষয় সরাসরি দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলায় যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ভারতীয় জনমতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।


সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ভারত কি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে, নাকি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গেই নতুন বাস্তবতায় সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করবে? বিশ্লেষকদের কেউ মনে করছেন, মতপার্থক্য বাড়লেও দুই দেশই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। বিশেষ করে একটি চূড়ান্ত বাণিজ্যচুক্তি হলে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির ধরন, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, বাণিজ্য ও শুল্ক এবং অভিবাসন ইস্যু—সব মিলিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন নতুন এক কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি।


সূত্র: আল-জাজিরা।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯