হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে উড়োজাহাজ থেকে নামার পর লাগেজের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার দিন শেষ করতে নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, উড়োজাহাজ অবতরণের পর প্রথম লাগেজ ১২ মিনিটের মধ্যে এবং সর্বশেষ লাগেজ সর্বোচ্চ ৪০ মিনিটের মধ্যে যাত্রীর হাতে পৌঁছে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে জরিমানার মুখে পড়তে হবে। মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
মন্ত্রী জানান, তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করতে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে করা চুক্তিতে বিভিন্ন সেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম লাগেজ ১২ মিনিটের মধ্যে এবং সর্বশেষ লাগেজ ২৫ মিনিটের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে যেকোনো বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে সর্বোচ্চ ৪০ মিনিট পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। অর্থাৎ কোনো যাত্রী উড়োজাহাজ থেকে নেমে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার লাগেজ পাওয়ার কথা। আর এই সেবা দিতে ব্যর্থ হলে শুধু অভিযোগ গ্রহণ করেই বিষয়টি শেষ হবে না, বরং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে।
শুধু লাগেজ সরবরাহ নয়, উড়োজাহাজ থেকে যাত্রী নামানো এবং যাত্রী ওঠানোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। ফলে তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রীসেবাকে আরও সময়নির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান টার্মিনালে যাত্রীরা কত সময়ের মধ্যে লাগেজ পাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমানে অধিকাংশ যাত্রী ৪০ মিনিটের মধ্যেই লাগেজ পাচ্ছেন। গত এক মাসে ৪০ মিনিটের বেশি সময় লাগার ঘটনা তিনি দেখেননি বলেও জানান। তবে পুরোনো টার্মিনালগুলোতে তৃতীয় টার্মিনালের মতো সেবা নিশ্চিত করতে আরও সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
এর মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সময় নিয়েও নতুন তথ্য দিয়েছেন মন্ত্রী। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটির আংশিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তবে পুরোপুরি কার্যক্রম চালু করতে এরপর আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। বহুল প্রতীক্ষিত এই টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বিমানবন্দরে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করছে সরকার। বিশেষ করে লাগেজ সরবরাহ, যাত্রী ওঠানামা এবং অন্যান্য সেবায় নির্দিষ্ট সময়সীমা কার্যকর হলে বিমানবন্দরের সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগও কমতে পারে।
এদিকে দেশের এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক রুটে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী। আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে বিভিন্ন এয়ারলাইনস আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। এর মধ্যে এয়ার এশিয়া পেনাং থেকে কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সরকার বাংলাদেশকে একটি এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করছে। নতুন নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট চালু, বিদেশি এয়ারলাইনসের কার্যক্রম বাড়ানো এবং দেশের নিজস্ব বিমান সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই খাতকে আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তুলনামূলক ছোট বহর। মন্ত্রী জানান, বিমানের বহর ছোট হওয়ায় চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক রুটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এয়ারলাইনস বাংলাদেশ থেকে দিনে একাধিক ফ্লাইট পরিচালনা করলেও বিমান অনেক রুটে সেই সক্ষমতা দেখাতে পারছে না।
বিমানের বহর বাড়ানো গেলে ফ্লাইটের সংখ্যা ও গন্তব্য বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের টিকিটের দামও কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে জানান মন্ত্রী। বেশি উড়োজাহাজ, বেশি যাত্রী এবং নতুন গন্তব্য—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে যাত্রীসেবার মানও বাড়বে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। জাপান রুট নিয়েও আশাবাদ জানিয়েছেন মন্ত্রী। এই রুটে বিমানের ফ্লাইট লাভজনক হচ্ছে দাবি করে সেখানে দ্বিতীয় ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মাধ্যমে বিমানের আয় আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বহর সম্প্রসারণে শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনার ওপর নির্ভর না করে লিজের মাধ্যমেও উড়োজাহাজ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বিমানের সক্ষমতা বাড়িয়ে আরও বেশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা এবং দেশের যাত্রীদের নিজস্ব জাতীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজে পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু, লাগেজ সরবরাহে সময়সীমা ও জরিমানা, কক্সবাজারের আন্তর্জাতিকীকরণ এবং বিমানের বহর সম্প্রসারণ—এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দেশের বিমান পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত সময়সীমা ও পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।