বাংলাদেশের সংবিধানের সম্ভাব্য ১৮তম সংশোধনী নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই সংশোধনীর ভিত্তি

জুলাই সনদের যেখানে ‘ভিন্নমত’ সেখানে প্রাধান্য পাবে ইশতেহার

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪২ সময় , আপডেট সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪২ সময়

বাংলাদেশের সংবিধানের সম্ভাব্য ১৮তম সংশোধনী নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই সংশোধনীর ভিত্তি সরাসরি গণভোটের রায় নয়—বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে তৈরি জুলাই জাতীয় সনদ, সেখানে থাকা ঐকমত্য ও ভিন্নমত, ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার এবং দলটির ৩১ দফা—এসব বিষয়কে সামনে রেখেই সংশোধনীর খসড়া তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।


বিশেষ করে জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বিএনপি ও তাদের মিত্র দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির নেতারা। ফলে সম্ভাব্য ১৮তম সংশোধনীকে গণভোটের রায়ের সরাসরি বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এদিকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিশেষ কমিটির কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গত ১৩ জুলাই কমিটি গঠন করা হলেও প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৪ আগস্ট। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর দ্বিতীয় বৈঠক হয় ২০ সেপ্টেম্বর। এবার আবারও বৈঠকে বসছে কমিটি। এবারের বৈঠকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতামত নেওয়ার কথা রয়েছে।


কমিটির প্রথম বৈঠকেই রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদকসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দলগুলোর পর এবার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হলে আগামী বছরের জানুয়ারিতে ২০২৭ সালের প্রথম সংসদ অধিবেশনেই সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী বিল উত্থাপিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে।


২০ সেপ্টেম্বরের বৈঠক শেষে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, কমিটি দ্রুত এগোতে চায় এবং সম্ভব হলে প্রতি সপ্তাহে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে নোট অব ডিসেন্টসহ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষ কমিটি সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয় সেটিকে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করবে।


রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করেই জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করা হয়েছিল। পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়। তবে বামপন্থী চারটি দল সনদে স্বাক্ষর করেনি। সব মিলিয়ে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করে। সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধান সম্পর্কিত। এসব সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে এসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।


গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর ওই আদেশ অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠনের পর সেই সংস্কার পরিষদ আর গঠিত হয়নি। বিএনপি জোটের সংসদ সদস্যরাও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এই পরিস্থিতিতে জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিশেষ কমিটির অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া হবে। আর যেসব বিষয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল, সেগুলো ভিন্নমত হিসেবেই বিবেচনায় থাকবে। এর বাইরে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা সংস্কার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।


বিশেষ কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও জানিয়েছেন, জুলাই সনদেই ভিন্নমতের বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকলে এবং সেই দ্বিমতের ভিত্তিতে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে কোনো প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে সেটি প্রাধান্য পাবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোটাররা ঠিক কী বিষয়ে মতামত দিয়েছিলেন?


১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই পৃথক রঙিন ব্যালটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। চারটি বিষয়কে একটি প্রশ্নের আওতায় এনে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। গণভোটের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ও ছিল।


এ ছাড়া সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ও গণভোটের প্রশ্নে ছিল। আর জুলাই সনদের অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের কথাও গণভোটের প্রশ্নে রাখা হয়েছিল।


অন্যদিকে গত বছরের ১৩ নভেম্বর জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ’-এ বলা হয়েছিল, সংবিধান সংস্কার পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে বর্তমানে বিশেষ কমিটির আলোচনায় উচ্চকক্ষ গঠনের মতো কিছু বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে অনেক রাজনৈতিক দল একমত। এটি সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে না; বরং সংসদে পাওয়া আসনের আনুপাতিক হারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। তবে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা উচ্চকক্ষের থাকবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।


ফলে এখন সংবিধানের ১৮তম সংশোধনী নিয়ে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই সনদের ঐকমত্য ও ভিন্নমত, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক কাঠামো। ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন এবং এরপর সংসদে বিল উত্থাপনের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯