পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় হয়নি, বরং গভীর ষড়যন্ত্র ও ইভিএম ‘হাইজ্যাক’ করে জোরপূর্বক হারিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমনই বিস্ফোরক দাবি করেছেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করে পুরোনো ভোটার তালিকার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গসহ চার রাজ্যে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনী বিপর্যয়ের প্রায় পাঁচ মাস পর শনিবার কলকাতার বাইরে প্রথম রাজনৈতিক সমাবেশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্থানীয় পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে কলকাতা হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে হুগলির শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় তৃণমূলের এই জনসভা। সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এসআইআর বাতিল করে পুরোনো ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গে অবিলম্বে পুনর্নির্বাচন নিতে হবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানাতেও নতুন করে ভোট আয়োজনের দাবি জানান তিনি।
মমতার অভিযোগ, ইভিএমে কারচুপি এবং এসআইআরের অপব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ভোটে তৃণমূল পরাজিত হয়নি, বরং ষড়যন্ত্র করে দলটিকে হারানো হয়েছে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। পাশাপাশি দাবি করেন, সাধারণ মানুষ এখনো তৃণমূলের সঙ্গেই রয়েছেন। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারেরও তীব্র সমালোচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। ব্যঙ্গ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ নামে অভিহিত করেন তিনি।
মমতার দাবি, বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯২ লাখ বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এমনকি তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবিও তোলেন তৃণমূল নেত্রী। সমাবেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ করেন মমতা। তাঁর দাবি, সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার, রেশন কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তিনি। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদ এবং বিভিন্ন এলাকায় সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির অভিযোগও করেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে শ্রীরামপুরের জনসভায় যাওয়ার পথে উত্তরপাড়ায় হামলার মুখে পড়েন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর গাড়িবহরকে একদল বিক্ষোভকারী কালো পতাকা দেখায়, স্লোগান দেয় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তাঁর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কাঁধে চোট পাওয়ার দাবি করেন কুণাল ঘোষ। পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি কলকাতায় ফিরে যান। এ ঘটনার পেছনে বিজেপিকে দায়ী করেন কুণাল ঘোষ। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগটি অস্বীকার করে বলা হয়েছে, এটি তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দলের প্রতি মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে একই ইস্যুতে কলকাতার হাজরা মোড়ে পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে কংগ্রেস। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবিতে সেখানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। সমাবেশ চলাকালে নির্বাচন কমিশনের কুশপুত্তলিকা দাহের চেষ্টা করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তৃণমূল যেখানে নির্বাচন নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবি করছে, সেখানে বিজেপি এসব অভিযোগের পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নির্বাচন ও এসআইআর ইস্যু নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।