ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, সম্মান, কোমলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি শুধু নিজের পরিবারে ভালোবাসার চর্চা করেননি, বরং উম্মতের জন্যও দাম্পত্য জীবনের সুন্দর আচরণের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম; আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের চেয়েও উত্তম।’ এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ একজন মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দাম্পত্য জীবনে মহানবী (সা.)-এর অনুসরণীয় এমন ১০টি ভালোবাসার সুন্নত রয়েছে।
এক. ভালোবাসা প্রকাশ করা।
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা মনে লুকিয়ে না রেখে তা প্রকাশ করতেন মহানবী (সা.)। সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মানুষের মধ্যে তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কে। উত্তরে তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলেন, আয়েশা (রা.)। পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কে—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তাঁর পিতা আবু বকর (রা.)।
আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা থেকেও মহানবী (সা.)-এর আন্তরিক ভালোবাসার নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি তাঁর ব্যবহৃত পাত্রের একই জায়গা থেকে পানি পান করতেন। এতে দাম্পত্য জীবনে আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
দুই. স্ত্রীর মুখে খাবারের লোকমা তুলে দেওয়া।
স্ত্রীর প্রতি ছোট ছোট যত্নকেও ইসলামে মূল্য দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) জানিয়েছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যয় করা সম্পদের জন্য যেমন সওয়াব রয়েছে, তেমনি ভালোবেসে স্ত্রীর মুখে তুলে দেওয়া একটি লোকমার জন্যও সওয়াব রয়েছে।
অর্থাৎ, দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা প্রকাশের ছোট একটি কাজও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে।
তিন. স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলা করা।
স্ত্রীর মন ভালো রাখতে মহানবী (সা.) আনন্দ ও খেলাধুলাতেও অংশ নিতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক সফরে তিনি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। একবার আয়েশা (রা.) জয়ী হন। পরবর্তীতে আবার দৌড় প্রতিযোগিতা হলে মহানবী (সা.) জয়ী হয়ে আগের জয়ের কথা স্মরণ করে হাস্যরস করেন।
এ ঘটনা দাম্পত্য জীবনে আনন্দ, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সময় দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে।
চার. স্ত্রীর জন্য নিজেকে পরিপাটি রাখা।
নিজের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের ব্যাপারেও মহানবী (সা.) যত্নশীল ছিলেন। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ঘরে প্রবেশ করার পর প্রথমেই মিসওয়াক করতেন।
পরিচ্ছন্ন থাকা এবং স্ত্রীর সামনে নিজেকে পরিপাটি রাখা দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সম্মান ও যত্নের প্রকাশ।
পাঁচ. স্ত্রীর সান্নিধ্যে বিশ্রাম নেওয়া।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) তাঁর কোলে মাথা রেখে বিশ্রাম নিতেন এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করতেন। এমনকি আয়েশা (রা.) ঋতুবতী থাকা অবস্থাতেও তিনি তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেন।
এতে বোঝা যায়, নারীর স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে তাকে দূরে সরিয়ে না রেখে ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে পাশে থাকার শিক্ষা রয়েছে।
ছয়. একই পাত্র থেকে গোসল করা।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি এবং মহানবী (সা.) একই পাত্রের পানি দিয়ে গোসল করতেন। মাইমুনা (রা.) থেকেও এ ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়।
দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও স্বাভাবিক সম্পর্কের এটিও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
সাত. স্ত্রীর পছন্দ ও আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া।
ঈদের দিনে হাবশি যুবকদের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া প্রদর্শন দেখতে চেয়েছিলেন আয়েশা (রা.)। মহানবী (সা.) তাঁর ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে সেই খেলা দেখার সুযোগ দেন।
আয়েশা (রা.) তাঁর কাঁধের ওপর চিবুক রেখে খেলা দেখেছিলেন এবং নিজের ইচ্ছায় দেখা শেষ না করা পর্যন্ত মহানবী (সা.) সেখানেই ছিলেন।
এ ঘটনা দাম্পত্য জীবনে একে অপরের পছন্দ ও আনন্দকে সম্মান করার শিক্ষা দেয়।
আট. স্ত্রীর প্রিয় মানুষদের সম্মান করা।
প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করার বহু বছর পরও মহানবী (সা.) তাঁর অবদান ও ভালোবাসাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন। তিনি খাদিজা (রা.)-এর বান্ধবীদেরও সম্মান করতেন এবং বাড়িতে পশু জবাই হলে তাঁদের জন্য মাংস পাঠাতেন।
এ থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীর প্রিয় মানুষ ও সম্পর্কগুলোকেও সম্মান করা দাম্পত্য ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নয়. গৃহস্থালির কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা।
মহানবী (সা.) ঘরের কাজে পরিবারকে সহযোগিতা করতেন। আয়েশা (রা.) জানিয়েছেন, তিনি পরিবারের কাজে অংশ নিতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন এবং ঘরের পরিচ্ছন্নতার কাজেও সহযোগিতা করতেন। নামাজের সময় হলে তিনি নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন।
অর্থাৎ, ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা মর্যাদা কমায় না; বরং মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে এটি একটি অনুসরণীয় শিক্ষা।
দশ. সুন্দর ও আদুরে নামে ডাকা।
দাম্পত্য জীবনে সুন্দর সম্বোধনেরও গুরুত্ব রয়েছে। মহানবী (সা.) আয়েশা (রা.)-কে আদর করে ‘হুমাইরা’ নামে ডাকতেন। ভালোবাসাপূর্ণ ও মধুর সম্বোধন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিকতা বাড়াতে পারে এবং সম্পর্ককে আরও কোমল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন থেকে ভালোবাসা, সম্মান, কোমল আচরণ, সহযোগিতা এবং একে অপরের অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়। ইসলামে আদর্শ দাম্পত্য শুধু দায়িত্ব পালনের সম্পর্ক নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মায়া, বন্ধুত্ব, যত্ন ও পারস্পরিক সম্মান।