একসময় যে মাটির ঘর ছিল গ্রামবাংলার প্রতিটি পরিবারের চেনা ঠিকানা, সময়ের স্রোতে সেই ঘরই এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

প্রজন্মের স্মৃতি বুকে নিয়ে টিকে আছে মাটির ঘর

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:৮ সময় , আপডেট সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:৮ সময়

একসময় যে মাটির ঘর ছিল গ্রামবাংলার প্রতিটি পরিবারের চেনা ঠিকানা, সময়ের স্রোতে সেই ঘরই এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। পুরু মাটির দেয়াল, খড় বা টিনের ছাউনি আর উঠানে মাটির লেপ—সব মিলিয়ে একসময়কার গ্রামীণ জীবনের সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতি। তবে সখীপুরের কিছু গ্রামে এখনো টিকে আছে সেই পুরোনো মাটির ঘর, যেখানে শুধু মানুষই থাকছেন না, দেয়ালের সঙ্গে যেন আটকে আছে কয়েক প্রজন্মের সুখ-দুঃখ আর অসংখ্য স্মৃতি। টাঙ্গাইলের সখীপুরের গ্রামাঞ্চলে একসময় প্রায় প্রতিটি জনপদেই দেখা যেত মাটির ঘর। ঈদের আগে এসব ঘর লেপাপোছা করে নতুন করে সাজানো হতো। ঘর পরিচ্ছন্ন করার সেই আয়োজনেও মিশে থাকত উৎসবের আনন্দ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব ঘরেই কেটেছে মানুষের শৈশব, কৈশোর এবং সংসারজীবন।


কিন্তু সময় বদলেছে। টিনের ঘর পেরিয়ে এখন গ্রামবাংলার অনেক পরিবার তৈরি করছে পাকা ভবন। আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে গ্রামের স্থাপত্যও। ফলে সখীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে একসময়কার পরিচিত মাটির ঘর। তবে সব ঘর এখনো হারিয়ে যায়নি। সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের পাথারপুর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী আনোয়ারা খাতুন এখনো স্বামীর রেখে যাওয়া মাটির ঘরেই বসবাস করছেন। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ঘরই তার ঠিকানা। প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী মারা গেলেও তিনি ঘরটি ছেড়ে যাননি। দীর্ঘ জীবনের সুখ-দুঃখ আর অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ঘরের প্রতিটি দেয়ালের সঙ্গে।


একই চিত্র হতেয়া রাজাবাড়ী ইউনিয়নের হতেয়া গ্রামের ৭০ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগমের জীবনেও। মৃত রমিজ উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা সারাজীবন মাটির ঘরেই কাটিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জীবনের শেষ সময়টুকু সেই পুরোনো ঘরেই কাটছে। তার মেয়ে নাজমা আক্তারের কাছে এই ঘর শুধু বসতবাড়ি নয়, বরং মায়ের জীবনের সুখ-দুঃখের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। উপজেলার করুটিয়াপাড়া, হতেয়া, পাথারপুর, কচুয়া, বড়চওনা ও ছোট মৌশাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো কিছু মাটির ঘর দেখা যায়। কোনোটি এখনো বসতঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোনোটি পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। আবার কোনো কোনো পরিবার পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতে পুরোনো ঘরটি ভেঙে নতুন ভবনও তৈরি করেনি।


স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় বাপ-দাদার তৈরি মাটির ঘরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বসবাস করত। পুরু মাটির দেয়াল গরমের সময় ঘরের ভেতর তুলনামূলক ঠান্ডা রাখত। কোথাও কোথাও তৈরি করা হতো দুইতলা মাটির ঘরও। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে পরিবারের সদস্যরা ওপরের তলায় যাতায়াত করতেন। স্থানীয়ভাবে এসব ঘর পরিচিত ছিল ‘কোঠা ঘর’ নামে। মাটির ঘর তৈরিরও ছিল নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী কৌশল। মাটির সঙ্গে তুষ ও চুনা মিশিয়ে কাঠের খুঁটির ওপর স্তরে স্তরে মাটি লেপে তৈরি করা হতো পুরু দেয়াল। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই নির্মাণশৈলীও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।


পাথারপুর গ্রামের কৃষক লাল মিয়া জানান, তাদের বাড়িতে বাপ-দাদার আমল থেকেই মাটির ঘর ছিল। এখন পরিবারের অন্যরা টিনের ঘরে থাকলেও তার মা এখনো সেই মাটির ঘরেই বসবাস করেন। পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতেই ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়নি। ছোট মৌশা গ্রামের কৃষক মো. শহিদুল ইসলামের স্মৃতিতেও মাটির ঘরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শৈশব। জন্মের পর থেকেই তিনি বাবা-মাকে এই ঘরে বসবাস করতে দেখেছেন। ঈদের আগে বাবা-মা ঘরটি নতুন করে লেপে দিতেন। সেই সময় পুরোনো ঘরটিও যেন ঈদের আনন্দে নতুন প্রাণ ফিরে পেত।


সখীপুর সরকারি কলেজের ভূগোল বিষয়ের প্রভাষক মোছা. নাছিমা আক্তার মনে করেন, গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মাটির ঘরের সম্পর্ক ছিল গভীর। একসময় টিনের ঘর কিংবা পাকা দালানের প্রচলন কম থাকায় মানুষ মূলত মাটির ঘরেই বসবাস করত। এখন এসব ঘরের সংখ্যা কমে গেলেও কোথাও কোথাও মানুষ এখনো সেখানে বসবাস করছেন। আর তাদের জীবনের বহু স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এসব ঘরের সঙ্গে।


তাই সখীপুরে টিকে থাকা অল্প কিছু মাটির ঘর এখন আর শুধু মাটি, তুষ আর চুন দিয়ে তৈরি স্থাপনা নয়। এগুলো একেকটি পরিবারের শৈশব, সংসার, ঈদের আনন্দ, ভালোবাসা আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মারক। আধুনিকতার চাপে যখন গ্রামবাংলার পুরোনো চেহারা বদলে যাচ্ছে, তখন এই মাটির ঘরগুলো নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে একটি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ জীবনের।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯