মাত্র ৫৭ দিনের দায়িত্বের পর উপাচার্য পরিবর্তন—আর এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে উপাচার্য কার্যালয়ের প্রধান দরজায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তালা। দরজায় হাতে লেখা চিরকুটে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—‘এই তালা শুধু সায়েম স্যার খুলতে পারবেন।’ গত সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই প্রজ্ঞাপনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন প্রকাশের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার রাতেই হল থেকে বের হয়ে স্বাধীনতা চত্বরে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। পরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা উপাচার্য ভবনে যান এবং কার্যালয়ের প্রধান দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে সর্বাত্মক শাটডাউন ও গণ-অবস্থানের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। নবনিযুক্ত উপাচার্য যাতে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারেন, সে জন্য প্রধান ফটক বন্ধ করে রাখেন তারা। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন। একই দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পাশাপাশি চুয়েটের ৩৬টি শিক্ষার্থী ক্লাব এবং চুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনও আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
দুপুর ১২টার দিকে চুয়েট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে প্রেস ব্রিফিং করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সেখানে তারা স্পষ্ট করে জানান, সদ্য জারি করা উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের নতুন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাবসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তবে নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবা আন্দোলনের আওতামুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা আরও ঘোষণা দিয়েছেন, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে উপাচার্য ভবনের সামনে গণ-অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলবে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাদের কর্মসূচি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিয়ে তাদের ঘোষিত অবস্থান ও উদ্বেগ থেকেই এই আন্দোলন।
দুপুর ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা লাঞ্চ বিরতিতে যান। তবে নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তারা আবারও প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। পরে বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বহনকারী তিনটি বাস এবং শিক্ষার্থীদের চারটি খালি বাস ক্যাম্পাস থেকে নগরীর উদ্দেশে রওনা দেয়। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কেউ ক্যাম্পাস ছেড়ে যাননি।
সব মিলিয়ে মাত্র ৫৭ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চুয়েটে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এখন কোন দিকে গড়ায়, সেটিই দেখার বিষয়। শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।