জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরার প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইস্তাম্বুলে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির পর তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে বহনকারী তুর্কি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিষয়টি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও অন্যান্য সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটরশোভাযাত্রা করে তাঁকে নিউইয়র্কের হাইয়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে নেওয়া হয়। সফরকালে সেখানেই অবস্থান করবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর বিএনপি নেতা-কর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ বিমানবন্দর ও হোটেলের আশপাশে জড়ো হয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন নিয়ে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। তবে এই সফরের মূল গুরুত্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মসূচিতে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান। তাঁর জন্য প্রায় ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রয়েছে এবং নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে, যদিও সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া কর্মসূচি অনুযায়ী, তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় গুরুত্ব পাবে। এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিলস-আইমের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
একই দিনে জাতিসংঘের বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে। সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত বিশ্বনেতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি। পাশাপাশি জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর নিয়ে বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন। এদিন ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে সাক্ষাতের কর্মসূচিও রয়েছে।
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মূল ভাষণের দিনেও থাকছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, কুয়েতের যুবরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জায়েদ আল হুসেইনের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টার দিকে এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এই সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে তারেক রহমানের পারিবারিক ধারাবাহিকতা। তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং মা খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। এবার ২৪ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান ভাষণ দিলে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তাঁর জাতিসংঘের এই মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা ঘটবে। সব মিলিয়ে, নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর সামনে রয়েছে ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি, একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগ। তবে পুরো সফরের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকছে ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ।