সন্তান অপরাধ করলে এবার শাস্তির মুখে পড়তে পারেন বাবা-মাও—এমন একটি কঠোর পরিকল্পনা সামনে এনেছে যুক্তরাজ্য সরকার। জরিমানা থেকে সরকারি ভাতা কমানো, এমনকি চরম পরিস্থিতিতে কারাদণ্ড—অভিভাবকদের জন্য এমন বিধানের কথা জানিয়েছেন দেশটির যুব বিচারবিষয়কমন্ত্রী জেক রিচার্ডস। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন সমাজবিজ্ঞানী ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে কোনো শিশু অপরাধে জড়ালে শুধু শিশুর আচরণ সংশোধন নয়, অভিভাবকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। সরকারের যুক্তি, সন্তানদের অপরাধমূলক আচরণ নিয়ন্ত্রণে বাবা-মা বা অভিভাবকদেরও নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকতে হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘প্যারেন্টিং অর্ডার’ বা অভিভাবকত্ব আদেশকে আরও শক্তিশালী করা। এই আদেশের আওতায় কোনো বাবা-মা বা অভিভাবককে সন্তানের আচরণ সংশোধনের জন্য বাধ্যতামূলক কাউন্সেলিংয়ে অংশ নিতে হতে পারে। প্রয়োজন হলে আবাসিক প্রশিক্ষণ বা কোর্সেও পাঠানো হতে পারে। আর এসব নির্দেশনা অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হতে পারে। যুব বিচারবিষয়কমন্ত্রী জেক রিচার্ডস জানিয়েছেন, চরম ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে অভিভাবককে কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে বিচারকের হাতে।
মন্ত্রী এই ব্যবস্থাকে পুরস্কার ও শাস্তির সমন্বিত পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ সন্তানকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে যেসব অভিভাবক সহযোগিতা করবেন, তাদের উৎসাহিত করা হবে। আর যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সহযোগিতা করবেন না, তাদের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালতকে প্যারেন্টিং অর্ডার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হয়। ভবিষ্যতে ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের ক্ষেত্রেও এই আদেশ ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হতে পারে।
একটি প্যারেন্টিং অর্ডারের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারে। আর আদালতের দেওয়া এই আদেশ অমান্য করাও একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকের বেশি সময়ে এই আদেশের ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে যেখানে এক হাজারের বেশি প্যারেন্টিং অর্ডার দেওয়া হয়েছিল, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৩৩টিতে দাঁড়ায়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করলে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদের দায়িত্বশীলতা বাড়তে পারে। এর আগে মে মাসে তৎকালীন বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও জানিয়েছিলেন, প্যারেন্টিং অর্ডার শক্তিশালী করা হলে যারা সন্তানের আচরণ সংশোধনে ইচ্ছাকৃতভাবে সহযোগিতা করবেন না, তাদের বাস্তব পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে সরকারের এই পরিকল্পনার সমালোচনাও শুরু হয়েছে। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিকি রাটারের দাবি, প্যারেন্টিং অর্ডার কার্যকর নয়—এমন যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তাঁর মতে, জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হলে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলো আরও বেশি আর্থিক সংকটে পড়তে পারে।
এ ছাড়া ইয়ুথ জাস্টিস জার্নালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে চালুর পর থেকে এই আদেশের কার্যকারিতা সীমিত ছিল। সেখানে সন্তানের আচরণ সংশোধনে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে অভিভাবকদের স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। ফলে যুক্তরাজ্য সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—অভিভাবকদের ওপর কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা কিশোর অপরাধ কমাতে কতটা কার্যকর হবে, আর এর ফলে পরিবারগুলোর ওপর কী ধরনের সামাজিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগে এই বিষয়গুলো নিয়েই বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।