চার দশকেরও বেশি সময় আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা তুলে ধরেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এবার একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে জিয়াউর রহমানের ১৯৮০ সালের সেই ভাষণ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। জনসংখ্যার চাপ, বেকারত্ব, ভূমিহীনতা, খাদ্যসংকট এবং কম মাথাপিছু আয়কে দেশের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জিয়াউর রহমানের ভাষণ অনুযায়ী, সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল জাপান ও নেদারল্যান্ডসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকারত্ব ও ভূমিহীনতার সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ২০ লাখ মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা জানান জিয়াউর রহমান। তাঁর বক্তব্যে স্বনির্ভরতাকে দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে দেশের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য এবং ১৯৮৫ সালের মধ্যে জন্মহার কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা জানান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি বিদ্যালয় ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো এবং দেশের কোনো নারী, পুরুষ বা শিশু যেন খাদ্য, আশ্রয় ও পোশাক থেকে বঞ্চিত না হয়—সেই লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা। তিনি মনে করতেন, আঞ্চলিক শান্তি, জাতীয় উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার আহ্বান জানান। অন্য অঞ্চলের অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা উত্তেজনা কমাতে এবং অভিন্ন স্বার্থে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিশ্বের বড় একটি অংশ দারিদ্র্য ও বঞ্চনার মধ্যে থাকলে স্থায়ী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। এ কারণে উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানো, সম্পদ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বৃদ্ধি, ন্যায্য বাণিজ্য এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহায়তার কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের কথাও জাতিসংঘে তুলে ধরেছিলেন জিয়াউর রহমান। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তেল ও জ্বালানি সহায়তায় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। ভাষণের শেষদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান জিয়াউর রহমান। মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও প্রযুক্তি বিশ্বে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এবার সেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেবেন। এর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসার কথা রয়েছে। ফলে ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যে মঞ্চে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতার কথা বলেছিলেন, চার দশকের বেশি সময় পর সেই একই মঞ্চে তাঁর ছেলে তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন সময়ের অগ্রাধিকার ও আন্তর্জাতিক অবস্থান তুলে ধরতে যাচ্ছেন।