একদিকে জ্বর, অন্যদিকে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খিঁচুনি, টাইফয়েড, চিকুনগুনিয়াসহ নানা জটিল রোগ। ফলে সারাদেশ থেকে শিশু রোগী নিয়ে ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছুটে আসছেন অভিভাবকরা। রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক শিশুকে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে খালি পাওয়া যেকোনো সিটেই ভর্তি করতে হচ্ছে। সকাল থেকেই হাসপাতালের প্রবেশমুখে দেখা যায় অভিভাবকদের ভিড়। কারও কোলে জ্বরে আক্রান্ত শিশু, আবার কেউ দূর-দূরান্ত থেকে সন্তানকে নিয়ে এসেছেন জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য।
চাঁদপুর থেকে আড়াই বছরের ইনসান হাসানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার মা ও নানি। শিশুটির ঠান্ডা, জ্বর ও কাশি রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে অণ্ডকোষের সমস্যা ও ইউরিন ইনফেকশন। চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। কুমিল্লার নাঙ্গলকোর্ট থেকে আড়াই মাসের শিশু রাধিকাকে নিয়ে এসেছেন তার মা। শিশুটির খিঁচুনির সমস্যা রয়েছে। আর নবাবগঞ্জের দোহার থেকে ১৩ বছরের খাদিজাকে নিয়ে এসেছেন তার মা। এক মাস ধরে জ্বরে ভুগছে মেয়েটি। ওষুধ খেলে জ্বর কমলেও ওষুধ বন্ধ করলেই আবার জ্বর ফিরে আসে বলে জানান তার মা।
সিলেট থেকে আসা তিন বছরের নূর আলম হোসাইনের অবস্থাও গুরুতর। তার পেটে টিউমার রয়েছে, সঙ্গে কয়েক দিন ধরে জ্বর। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সিট সংকটের কারণে পরিবারকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। হাসপাতালের ভেতরের পরিস্থিতিও বেশ উদ্বেগজনক। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু ছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হয়েছে। কোথাও সিট খালি হলে সেখানেই দেওয়া হচ্ছে রোগীকে জায়গা।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। জ্বর হওয়ার এক থেকে তিন দিনের মধ্যে এনএস ওয়ান পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সরকারি ব্যবস্থায় ডেঙ্গু পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পালস ও রক্তচাপ কমে যাওয়া, বমি, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, প্লাটিলেট কমে যাওয়া কিংবা রক্তক্ষরণের মতো লক্ষণ দেখা দিলে পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।
এদিকে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের সংক্রমণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় এখনো হাম ছড়িয়ে পড়ছে। টিকার কাভারেজ কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে টিকার কাভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে থাকা প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
অপুষ্টি ও পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধ না পাওয়াও শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। এমনকি অল্প বয়সী শিশুদের মধ্যেও হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। সব মিলিয়ে জ্বর, ডেঙ্গু, হামসহ নানা রোগে আক্রান্ত শিশুদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর এই বিশেষায়িত হাসপাতাল। চিকিৎসকদের পরামর্শ, শিশুদের জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।