একদিকে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে কঠোর নিয়ম, অন্যদিকে সেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষই নেই! বাগেরহাটের চিতলমারীর সাবোখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এমনই এক বৈপরীত্যের চিত্র সামনে এসেছে। মোবাইল, মোটরসাইকেল আর বাইরের খাবার বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো গেলেও জায়গার অভাবে কয়েকটি ক্লাস করতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে বটগাছতলায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে তিনটি নিয়মকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে দুপুরের টিফিন নিয়ে আসতে হবে, টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে দোকানের খাবার খাওয়া যাবে না এবং বিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল আনা যাবে না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়মগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, আগের তুলনায় শ্রেণিপাঠে মনোযোগ বেড়েছে শিক্ষার্থীদের। একই সঙ্গে বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ঝুঁকি কমেছে এবং মোটরসাইকেল ব্যবহারের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কমেছে।
সাবোখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপদ ভঞ্জন মণ্ডল জানান, সম্প্রতি চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বিদ্যালয়ে আয়োজিত অভিভাবক সমাবেশে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেন। এরপর থেকেই বিদ্যালয়ে নিয়মগুলো কঠোরভাবে মানা হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হলেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কয়েকটি শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে বিদ্যালয়ের বটতলায়। খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে নিয়মিত প্রায় ২২৪ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে আসে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির হিসাবে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২৫০। এত শিক্ষার্থী নিয়মিত উপস্থিত থাকলেও তাদের পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন চারতলা ভবন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদনও করা হয়েছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তিনি।
শুধু শ্রেণিকক্ষের সংকটই নয়, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, ফ্লোর ও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্ষাকালে টিনের চাল দিয়ে পানি পড়ে। ভেঙে গেছে হোয়াইট বোর্ড, নেই ডিজিটাল ক্লাসের ব্যবস্থাও। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মৌসুমী বিশ্বাসসহ অন্য শিক্ষার্থীরা বলছে, নতুন নিয়ম চালুর পর পড়াশোনায় মনোযোগ বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বটতলায় ক্লাস করার কারণে পড়াশোনায় নানা ধরনের অসুবিধা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আব্দুস শাকুরও বলছেন, শ্রেণিকক্ষের অভাবে খোলা আকাশের নিচে ক্লাস নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প নেই। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি লিমন বিশ্বাস ইউনুসও দ্রুত একটি নতুন চারতলা ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তার প্রশ্ন, অন্য কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম থাকা সত্ত্বেও নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও সাবোখালীতে এত শিক্ষার্থী থাকার পরও কেন পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই?
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন। বিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়ম চালুর সুফল মিললেও এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ ও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ। কারণ নিয়ম মেনে স্কুলে আসা শিক্ষার্থীরা যদি শেষ পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে বসেই ক্লাস করতে বাধ্য হয়, তাহলে তাদের জন্য একটি নতুন ভবনের দাবি কত দ্রুত পূরণ হয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়।