ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার পর একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হাসপাতালের নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই কেন তালাবদ্ধ ছিল? আগুনের আতঙ্কে রোগী ও স্বজনেরা যখন নিচে নামার চেষ্টা করছিলেন, তখন একটি সিঁড়ির ওপরই কেন নির্ভর করতে হলো সবাইকে? এর মধ্যেই পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ঘটনার পর গতকাল মঙ্গলবার সকালে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে কমিটিকে। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে।
এদিকে পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা যাওয়ার খবর সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার। হাসপাতাল পরিদর্শনের পর তিনি জানান, এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজনকে মৃতের তালিকায় রাখা হলেও তিনি জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। বাকি দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তবে এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আতঙ্কে একটি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত বের হতে গিয়ে পদদলিত হয়ে শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই তালাবদ্ধ ছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামতে গিয়ে এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। ফলে একটি সিঁড়ি দিয়ে একসঙ্গে অনেক মানুষ নামার চেষ্টা করায় আতঙ্ক ও ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। নিহত রমজান আলীর ছোট ভাই সাইফুল ইসলামের দাবি, তার ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। চারতলা থেকে একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে গিয়ে তিনি মারা যান। তার অভিযোগ, পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটি বন্ধ না থাকলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না।
একইভাবে কুলসুমা নামে এক নারীর স্বজনেরা জানিয়েছেন, আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে ষষ্ঠ তলা থেকে সন্তানদের নিয়ে নিচে নামার সময় তিনি পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে শাহাজাহান মনির নামে এক পল্লিচিকিৎসকের স্বজনদের দাবি, লিফটে আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে তিনি পদদলিত হয়ে মারা যান। তার স্ত্রীও জানিয়েছেন, মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে তিনি স্বামীকে হারিয়েছেন।
তবে সিঁড়িগুলো কেন বন্ধ রাখা হয়েছিল—এ প্রশ্নের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তার কারণে চারটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর সেগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে আগুন লাগার কারণ নিয়েও প্রাথমিক তথ্য দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের ধারণা, লিফটের নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে অতিরিক্ত তাপের কারণে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। পরে লিফটের তারের ভেতর দিয়ে আগুন ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকেই নজর। আগুনের সূত্রপাত, সিঁড়ি তালাবদ্ধ থাকার কারণ এবং মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা—সব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।