সিলেট থেকে ঢাকায় যেতে এখন যাত্রীদের সামনে যেন কোনো পথই স্বস্তির নয়। সড়কপথে উন্নয়নকাজের কারণে দীর্ঘ যানজট ও ধীরগতির যাত্রা, রেলপথে নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় আর আকাশপথে অতিরিক্ত ভাড়া—তিন পথেই বাড়ছে দুর্ভোগ। সড়কপথে যেখানে একসময় স্বাভাবিক সময়ে যাতায়াত সম্ভব ছিল, সেখানে এখন সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। আর রেলপথে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার যাত্রাতেও মিলছে না নির্ধারিত সময়ের নিশ্চয়তা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়নকাজ চলায় সড়কপথে ভোগান্তির পাশাপাশি রেলপথে যাত্রীর চাপও বেড়েছে। সিলেট রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী টিকিটও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা-সিলেট ছয় লেন মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতিও এখনো প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভৌত অগ্রগতি ছিল ২১ শতাংশ। পরে কাজের গতি কিছুটা বাড়লেও বর্তমানে অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৮ শতাংশে। সড়কের পাশের সাত জেলায় ৮২৯ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণে ধীরগতি এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে পুরো ভূমি অধিগ্রহণ শেষ করার আশা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
এদিকে নির্মাণকাজের কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি ও সার্ভিস লেনের কাজ চলছে। সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হচ্ছে গর্ত ও কাদা। আবার রোদে ধুলাবালির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা। ১৪টি স্থানে সড়ক বিভাজক বা পর্যাপ্ত যান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। দুর্ভোগ কমাতে সিলেট শহরের দিক থেকে প্রথম সাত কিলোমিটার সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন আরেকটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সড়কের লেনসংখ্যা নিয়েও। কাঁচপুর থেকে সিলেটের লালাবাজার পর্যন্ত মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হলেও লালাবাজার থেকে কদমতলী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত অংশ দুই লেনই থাকছে। পরিবহন শ্রমিকদের আশঙ্কা, এতে ভবিষ্যতে যানজট ও দুর্ঘটনা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে রেলপথেও স্বস্তি নেই। ইঞ্জিন সংকট, পুরোনো কোচ, নিয়মিত বিলম্ব এবং অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের কারণে সিলেট-ঢাকা রুটে শিডিউল বিপর্যয় প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে কালনী এক্সপ্রেস নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ বেশি। ২০১২ সালে চালুর সময় মাত্র চারটি স্টেশনে থামত ট্রেনটি এবং রুটটির দ্রুতগামী ট্রেন হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন এর যাত্রাবিরতি বেড়ে হয়েছে ১১টি। কমলাপুর থেকে প্রায়ই এক থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে ট্রেন। ফলে সিলেটে পৌঁছাতে অনেক সময় রাত ১১টা থেকে ১২টা বেজে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহের তথ্য বলছে, এই সময়ে একদিনও নির্ধারিত সময়ে সিলেটে পৌঁছাতে পারেনি কালনী এক্সপ্রেস। দেরিতে পৌঁছানোর কারণে গভীর রাতে স্টেশনে নামতে হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।
সবশেষে আকাশপথের পরিস্থিতিও যাত্রীবান্ধব নয়। দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত টিকিটের দামের কারণে অনেকের কাছেই বিমানযাত্রা হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। অর্থাৎ সিলেট-ঢাকা যাতায়াতে এখন সড়কপথে দীর্ঘ সময়, রেলপথে অনিশ্চিত শিডিউল আর আকাশপথে বাড়তি খরচ—তিন বিকল্পের কোনোটিই যেন যাত্রীদের স্বস্তি দিতে পারছে না। উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করে সড়কপথের দুর্ভোগ কমানো এবং রেলপথের শিডিউল ঠিক করাই এখন যাত্রীদের প্রধান প্রত্যাশা।