বিশ্ব কি আবার এমন এক ভয়ংকর সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুটি আলাদা যুদ্ধ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই থামবে ইরান যুদ্ধ!

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:২৭ সময় , আপডেট সময় : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:২৭ সময়

বিশ্ব কি আবার এমন এক ভয়ংকর সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুটি আলাদা যুদ্ধ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে? ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ এখন আর শুধু দুটি অঞ্চলের সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইউক্রেনের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে এসব সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারেও। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বর্তমান সময়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়গুলোর একটি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন বড় হুমকি তৈরি করেছে, তেমনি ইরানকে ঘিরে সংঘাত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।


এর পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ায় চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের উত্তেজনা এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে শক্তিধর দেশগুলোর সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ দুটি এখনো সরাসরি একীভূত হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দুই সংঘাতের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও প্রভাবের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। এ কারণেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এসব আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বড় আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।


ইউক্রেনের ড্রোন বিশেষজ্ঞদের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গিয়ে অভিজ্ঞতা ও কৌশল বিনিময়ের তথ্যও সামনে এসেছে। পাশাপাশি কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়া ও ইরানের একটি সামরিক চালান ধ্বংসের ঘটনাও দুই যুদ্ধের সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হরমুজ প্রণালি। দীর্ঘ সময় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ থাকলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। এদিকে দীর্ঘ সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশের ওপরই ভয়াবহ চাপ তৈরি করেছে। রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে মস্কোর অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে।


অন্যদিকে ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশ ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশটির জনমিতি ও অর্থনীতিতেও গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাতেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের ওপরও আঘাত এসেছে। অন্যদিকে ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। লেবানন, ইরাক, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল ও জর্ডান পর্যন্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে প্রায় সব পক্ষই। রাশিয়া ও ইউক্রেন দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসান চাইলেও নিজেদের শর্তে সমঝোতা ছাড়া কেউই পিছিয়ে যেতে রাজি নয়।


রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য যুদ্ধ শেষ করা রাজনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি। কারণ সমঝোতার মাধ্যমে বড় কোনো অর্জন ছাড়াই যুদ্ধ শেষ হলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একইভাবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রাশিয়ার কাছে ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে সমঝোতা করলে রাজনৈতিকভাবে বড় চাপের মুখে পড়তে পারেন। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত দ্রুত ফল পায়নি। প্রথম দফার হামলায় ইরানের সরকার পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং হামলায় বেসামরিক হতাহতের কারণে ইরানের জনগণের একটি অংশ সরকারের পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।


একই সঙ্গে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক ভাবমূর্তিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই জায়গাতেই ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ইরান সংকটে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাশিয়া যদি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তেহরানকেও সংঘাত থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করতে পারে মস্কো।


কারণ ইরান রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও মস্কোর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান শুধু ইউরোপের জন্য নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—দুই পক্ষই যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ খুঁজছে। মার্কিন প্রতিনিধিদের রাশিয়া ও ইউক্রেন সফর এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা সেই প্রচেষ্টারই অংশ। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।


এরই মধ্যে ইউক্রেনে রুশ হামলার মাত্রা বাড়ার খবরও আসছে। অন্যদিকে জেলেনস্কি পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ইউক্রেনের যুদ্ধ থামাতে পারলে তার প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রশমনের পথও খুলে দিতে পারে। আর সেই পথ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হরমুজ প্রণালি থেকে তাইওয়ান—একাধিক উত্তপ্ত অঞ্চলের সংঘাত একসঙ্গে আরও বড় সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯