জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে যতই মতপার্থক্য থাকুক, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর প্রশ্নে অবস্থান অনেকটাই এক। সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য থেকে শুরু করে রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের পর দুই পক্ষের পাল্টা কর্মসূচি—সবকিছুতেই ফুটে উঠেছে এই রাজনৈতিক ঐক্যের চিত্র।
ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের টানাপড়েন চলছে। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে একে অন্যের ওপর চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে না দেওয়ার বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান সতর্ক করে বলেন, গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে তা পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থানের পথ সহজ করে দিতে পারে। তাই ভিন্নমত থাকলেও রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও দেশে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। তার অভিযোগ, অতীতে অপরাধে জড়িত কিছু ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং দেশে ফেরার নানা বার্তা দিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
এরপর শুক্রবার রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনা দুই পক্ষের অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে। আওয়ামী লীগের ওই কর্মসূচির প্রতিবাদে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি পৃথকভাবে ঢাকায় মিছিল করে। সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের ওই মিছিলের সঙ্গে শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণার কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যেও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে ডিসেম্বরজুড়ে দেশব্যাপী পৃথক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপি ও ১১ দলীয় জোটের। এদিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি আসন ঢাকা-১৭ এলাকায় আওয়ামী লীগের মিছিল হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ।
ইতোমধ্যে এ ঘটনায় ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চৌকি বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালানো হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানও বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে আর মেনে নেওয়া হবে না।
অন্যদিকে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখনো কাটেনি। সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দল সদস্য না দেওয়ায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টনেও বিরোধের প্রভাব পড়েছে। ত্রয়োদশ সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে সদস্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে প্রয়োজন অনুযায়ী সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হতে পারে। গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনের জন্য ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে বিরোধী দলকে পাঁচজন সদস্যের নাম দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তারা তা দেয়নি।
বিরোধী দলের অবস্থান হলো, শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আগে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে এবং ঐকমত্যের বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পরই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগোবে। ১৩ জুলাই বিশেষ কমিটি গঠনের পর ৪ আগস্ট প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এখন পর্যন্ত সেটিই কমিটির একমাত্র বৈঠক। বিরোধী দল থেকে শেষ পর্যন্ত সদস্যদের নাম পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা থেকেই সরকারও কমিটির কার্যক্রমে তাড়াহুড়ো করছে না। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগকে ঘিরে অবস্থান একেবারেই ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। সামনে ডিসেম্বরকে ঘিরে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য তৎপরতা বাড়লে এই ইস্যুতেই দুই পক্ষের সমন্বিত রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে।