স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের তৎপরতা। বছরের শেষ দিকে ছয় বা সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হতে পারে ভোটের এই আয়োজন। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আর এরই মধ্যে প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি ভেতরে ভেতরে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই বিষয়টি তদারকি করছেন বলে জানা গেছে। ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন স্তরে বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশীর সংখ্যা অনেক বেশি। কোথাও কোথাও প্রতি পদে সাত থেকে ১৭ জন পর্যন্ত প্রার্থী আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ফলে একজনকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়াই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অনেক আগেই মাঠ গোছানোর কাজ শুরু করেছে। দলটির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত বা ঘোষণা করা হয়েছে বলে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন। সিটি করপোরেশনগুলোর প্রার্থীও প্রায় চূড়ান্ত হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি। সংশোধিত আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন কিংবা দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয়ভাবে নিজেদের পছন্দের একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীক না থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে দলীয় সমর্থনই প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় রাজনীতিতে ১১ দলীয় ঐক্যের অংশীদার হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই দলই জানিয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনে তারা জোটগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে না। তবে কোনো এলাকায় শরিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে একক প্রার্থী দিলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেওয়া হবে না বলে জানা গেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে মেয়র প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তরে জামায়াতে ইসলামীর মেয়র প্রার্থী হিসেবে মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকা উত্তরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
তাবিথ আউয়াল এর আগেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন। এম এ কাইয়ুমও বিগত সরকারের সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। আর শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনিও মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও তিন দলের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জামায়াত প্রাথমিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি মো. আবু সাদিক, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, তাকে মনোনীত করেছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। দলীয় সূত্রের দাবি, হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করেছেন। অন্যদিকে আব্দুস সালামের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নির্বাচনী সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা।
তরুণ প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ইশরাক হোসেনও। জামায়াতের সাদিক কায়েম এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো তরুণদের মোকাবিলায় বিএনপি তরুণ মুখকে সামনে আনতে পারে বলে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তার বাবা প্রয়াত ছাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও তার জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে বলে মনে করছেন দলের কয়েকজন নেতা। এদিকে স্থানীয় সরকারের সব স্তরে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি। জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকারেও ভালো ফল করতে চায়। দলটি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও অভিযোগ তুলে ধরেছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। পাশাপাশি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার দাবিও জানানো হয়। বৈঠক শেষে দলটির পক্ষ থেকে নয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তিন বড় রাজনৈতিক শক্তির মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি এখন স্পষ্ট। জামায়াত যেখানে আগেভাগেই প্রার্থী বাছাইয়ে অনেকটা এগিয়ে, সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টিও এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুলসংখ্যক আগ্রহী প্রার্থীর মধ্য থেকে প্রতিটি এলাকায় গ্রহণযোগ্য একজনকে বেছে নেওয়া।