খুনের পরও যেন শেষ হচ্ছে না নৃশংসতা। পরিচয় গোপন করতে মরদেহ টুকরো করে কখনো ড্রামে, কখনো বস্তা, কার্টন, পলিথিন কিংবা ব্যাগে ভরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে খাল-পুকুর বা সড়কের পাশে। রাজধানী থেকে মফস্বল—গত এক বছরে এমন অন্তত এক ডজন ঘটনার তথ্য সামনে এসেছে। তবে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের কোনো সমন্বিত জাতীয় হিসাব পুলিশের প্রকাশ্য প্রতিবেদনে নেই। সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীর আদাবরের হাক্কার মোড় এলাকার একটি খাল থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে ফরিদপুরের মধুখালীতে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে পড়ে থাকা তিনটি কার্টন থেকে উদ্ধার করা হয় আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সি এক ব্যক্তির ছয় টুকরা মরদেহ। দুটি ঘটনাতেই তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
রাজধানীর শাহবাগে রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের মরদেহ দুটি ড্রাম থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে উঠে আসে, হত্যার পর মরদেহটি ২৬ টুকরা করা হয়েছিল। মুগদায় সৌদিপ্রবাসী মোকাররম মিয়াকে হত্যার পর তার মরদেহ খণ্ডিত করার অভিযোগও রয়েছে। পল্টন-মতিঝিল এলাকায় ওবায়দুল্লাহকে হত্যার পর তার শরীরের বিভিন্ন অংশ রাজধানীর একাধিক স্থানে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সবুজবাগে একটি সেতুর নিচ থেকে অজ্ঞাত এক নারীর মাথা ও দুই হাত উদ্ধার করা হলেও তার শরীরের বাকি অংশ পাওয়া যায়নি। আর ডেমরায় আলী হোসেনকে হত্যার পর মরদেহ ১০ টুকরা করে ডিএনডি খালে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ হত্যার তথ্য জানতে পারে।
আদাবরের ঘটনায় পুলিশ জানায়, খালের পানিতে একটি কালো ব্যাগের ভেতর বিচ্ছিন্ন দুই হাত, মাথা ও শরীরের অন্যান্য অংশ পাওয়া যায়। নিহত নারীর পরনে ছিল মেরুন রঙের জামা ও জলপাই রঙের পায়জামা। তবে তার পা এখনো উদ্ধার হয়নি। নিহতের পরিচয় ও হত্যার কারণ জানতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে মধুখালীর বোয়ালিয়া এলাকায় মহাসড়কের পাশে তিনটি কার্টন পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। কার্টন থেকে দুর্গন্ধ বের হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে সেগুলো খুলে ছয় টুকরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে পুলিশ। নিহতের পরিচয় শনাক্তে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় নিখোঁজ কাস্টমস কর্মী রাকিব রায়হানের মরদেহ তিনটি ব্যাগ ও একটি কাপড়ের পোটলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে মরদেহটি ১৫ টুকরা করার কথা বলা হয়েছে। কুমিল্লার দেবীদ্বারে ফরিদা ইয়াসমিনের খণ্ডিত মরদেহ পাওয়া যায় নয়টি পলিথিনের প্যাকেটে। সেখানেও মাথা ও পায়ের অংশ তখনো উদ্ধার হয়নি। গত ২৫ জুন ফরিদপুরের সালথায় পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকিরের হাত-পা বিচ্ছিন্ন মরদেহ সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, জমিজমাসংক্রান্ত সালিশে অংশ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আগের রাতে তিনি হামলার শিকার হন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মরদেহ খণ্ডিত করার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য থাকে নিহতের পরিচয় গোপন করা, গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করা এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও ফরেনসিক তদন্তের কারণে এমন অপরাধে পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলা কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি আঙুলের ছাপ, সামান্য ডিএনএ কিংবা কয়েক সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজও এখন তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে। মোবাইল ফোনের তথ্য, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণের মাধ্যমে খণ্ডিত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যার নেপথ্যের ঘটনাও বের করার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ, অপরাধীরা মরদেহ টুকরা করে পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও তদন্তকারীদের হাতে থাকা সামান্য একটি আলামতই শেষ পর্যন্ত খুলে দিতে পারে পুরো হত্যারহস্যের দরজা।