দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সেই সম্পদ থেকে সংগৃহীত অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টনের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত বিধি চূড়ান্ত হলে তা পূর্ববর্তী সময়ের মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
সোমবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও বিদ্যমান কার্যপ্রণালী বিধিতে আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, জরিমানা এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মৌলিক বিধান রয়েছে। তবে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি কোন প্রশাসনিক বা সরকারি কাঠামোর মাধ্যমে জব্দ, নিলাম বা বিক্রি করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপদ্ধতি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালের একটি মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়েছে। প্রচলিত সরকারি পাওনা আদায় আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারায় সম্পত্তি বিক্রি এবং জরিমানা আদায়ের যে পদ্ধতি রয়েছে, প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে তার আদলে ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালী বিধিতে বিস্তারিত ব্যবস্থা যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
এতে ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের সময় সরকারের নির্বাহী বিভাগ একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, নিলাম ও বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এ বিষয়ে দুই ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও আইনজীবীদের অংশগ্রহণে একটি আইনি সেমিনার আয়োজনের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। সেখানে আলোচনা করে প্রস্তাবিত সংশোধনীর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হতে পারে।
এদিকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার নিজের নামে থাকা কোন সম্পদ বাজেয়াপ্তের আওতায় পড়বে, তা নিয়ে আইনি আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজের নামে প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন।
এর মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানতের তথ্য রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের দুটি মোটরগাড়ি, ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালঙ্কার এবং ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্রের কথাও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছিল। স্থাবর সম্পদের মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, গাজীপুর ও রংপুরে থাকা প্রায় ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি, ঢাকার পূর্বাচলে নিজের নামে থাকা ১০ কাঠার একটি প্লট এবং টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমির তথ্য রয়েছে।
তবে ঘোষিত সম্পদের বাইরেও তদন্তে অতিরিক্ত সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলোও আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আসতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় সম্পদের তথ্য নিয়ে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছিল। সে সময় ঘোষিত ৬ দশমিক ৫০ একর জমির বিপরীতে অনুসন্ধানে তার নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পত্তির তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল।তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে থাকা সম্পত্তির ক্ষেত্রে আইনি সীমারেখা রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ে সাধারণভাবে তার নিজের নামে ও একক মালিকানাধীন সম্পত্তিই বাজেয়াপ্ত করা যায়। পরিবারের অন্য সদস্য বা কোনো ট্রাস্টের নামে থাকা সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই, যদি না আদালতের পৃথক আদেশ বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয় যে ওই সম্পদ অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে অর্জন করে অন্যের নামে রাখা হয়েছিল।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটির মালিকানা শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নামে নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নিবন্ধিত সম্পত্তি হওয়ায় ট্রাস্টের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রে পৃথক আইনি প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া সুধা সদনের মালিকানা শেখ হাসিনার সন্তানদের নামে এবং গাজীপুরের মৌচাকে থাকা বাগানবাড়িটির মালিকানায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তাদের সন্তানদের নাম রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়েও মালিকানা ও সম্পদের উৎস আলাদাভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই করতে হবে।
পূর্বাচলে শেখ হাসিনা, তার সন্তান ও বোন-ভাগ্নেদের নামে বরাদ্দ নেওয়া মোট ৬০ কাঠা জমি নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা চলমান রয়েছে। সব মিলিয়ে, কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের মাধ্যমে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি শনাক্ত, বাজেয়াপ্ত, নিলাম বা বিক্রির প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশোধিত বিধি পূর্ববর্তী মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর হলে ইতোমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে আইনি কাঠামো আরও সুস্পষ্ট হবে। আর বাজেয়াপ্ত সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।