আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে আটটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। রোববার সকালে রাজধানী জাকার্তার সুকর্ণ-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রথম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিমানবন্দরের কাছাকাছি আকাশসীমায় আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ছাই শনাক্ত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ঘটনায় ১ হাজার ৫৫৮টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকার কথা ছিল।
শুক্রবার গভীর রাতে আগ্নেয়গিরিটি অগ্ন্যুৎপাত শুরু করে। এর ফলে আশপাশের এলাকায় একটানা ভূকম্পন, লাভার উদ্গিরণ এবং বিকট শব্দ শোনা যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোববার ভোরেও আগ্নেয়গিরিটি আরও দুটি অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়। পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিমান চলাচল বন্ধ থাকার কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সিঙ্গাপুরগামী ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটে। এ ছাড়া দোহা, সিডনি ও কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবহনমন্ত্রী দুডি পুরওয়াগান্ধি বলেন, পরীক্ষায় আগ্নেয়গিরির ছাই পশ্চিম জাভার দিকে ছড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়ার পর আরও কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে বিমান সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে যাদের সামনে ফ্লাইট রয়েছে, তাদের সময়মতো তথ্য দেওয়ার জন্যও তিনি এয়ারলাইনসগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে বিমানবন্দরগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি না হয়। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-ভৌত সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, আগ্নেয়গিরির ছাই জাভার পূর্ব দিকে প্রায় ২০ হাজার ফুট বা ৬ হাজার মিটার এবং আগ্নেয়গিরির পশ্চিম দিকে সুমাত্রা অভিমুখে প্রায় ৫০ হাজার ফুট বা ১৫ হাজার মিটার উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সুনামি সতর্কতা নেই বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। আনাক ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরিটি জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যবর্তী সুন্দা প্রণালিতে অবস্থিত। আক্রান্ত এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করার পাশাপাশি শ্বাসতন্ত্র, চোখ ও ত্বককে ছাইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কমপাস জানিয়েছে, শনিবার বেশ কয়েকটি স্কুল তাদের কার্যক্রম বাতিল করে। আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই চোখে জ্বালাপোড়ার কথা জানান। একই কারণে কয়েকজন জেলে সমুদ্রে মাছ ধরার পরিকল্পনাও বাতিল করেন এবং তারাও চোখে ব্যথা ও জ্বালাপোড়ার কথা জানান।
আলদি চান্দ্রা প্রাযোগি নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই তিনি চোখে অস্বস্তি অনুভব করছেন। তার মনে হচ্ছিল, “চোখের ভেতর ছোট ছোট বালুর দানা ঢুকে গেছে।” জ্বালাপোড়া কমাতে তাকে চোখে ড্রপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ধুলা ও ছাই এতটাই ঘন যে তাকে প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর বাড়ির সামনের উঠান ঝাড়ু দিতে হচ্ছে। ‘আনাক ক্রাকাতোয়া’ নামের অর্থ ‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’। গত শতাব্দীর শুরুতে সমুদ্র থেকে এটি জেগে ওঠে। ১৮৮৩ সালে মাউন্ট ক্রাকাতোয়ার ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হওয়া বিশাল আগ্নেয়গিরির গহ্বরের মধ্যেই পরবর্তীতে আনাক ক্রাকাতোয়ার সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে আগ্নেয়গিরিটি মাঝেমধ্যে সক্রিয় হয়ে আসছে।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আনাক ক্রাকাতোয়া ধসে পড়ে। এর ফলে ভয়াবহ সুনামির সৃষ্টি হয়। ওই সুনামিতে ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং সুমাত্রা ও জাভার উপকূলীয় এলাকায় আরও হাজারো মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আগ্নেয়গিরিটি ধসে পড়ার সময় সেখান থেকে সাগরে গড়িয়ে পড়া কিছু পাথরের খণ্ডের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৯০ মিটার।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ বলতে প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা আগ্নেয়গিরি, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা এবং টেকটোনিক প্লেটের একটি বিস্তৃত অঞ্চলকে বোঝানো হয়। এই অঞ্চলটি প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বা ২৫ হাজার মাইলজুড়ে বিস্তৃত। দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত থেকে শুরু করে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত এর বিস্তার রয়েছে। পৃথিবীর মোট ভূমিকম্পের প্রায় ৯০ শতাংশ এই অঞ্চলকে ঘিরে সংঘটিত হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশও এই ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে প্রায় ৪৫২টি পৃথক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে।