সহযাত্রী সেজে পরিচয় তৈরি, এরপর বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। কখনো খাবার, আবার কখনো পানীয় দেওয়ার প্রস্তাব। এভাবেই আস্থা অর্জনের পর সুযোগ বুঝে চেতনানাশক দ্রব্য প্রয়োগ করে যাত্রীকে অচেতন করে ফেলাই অজ্ঞান পার্টির পুরোনো কৌশল। এরপর টাকা, মুঠোফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে পালিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা।
দীর্ঘদিন ধরে বাস, ট্রেন, টার্মিনাল ও জনবহুল এলাকায় যাত্রীদের লক্ষ্য করে অপরাধ চালিয়ে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে অটোরিকশাচালকরাও এই চক্রের অন্যতম টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। গত আট মাসে রাজধানীতে অন্তত তিনজন অটোরিকশাচালক নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তিনটি ঘটনাতেই অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে তিনজন অটোরিকশাচালক হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে তিনটি ঘটনার ধরন ছিল ভিন্ন। একজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়, একজনকে অচেতন করার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় এবং আরেকজনের মরদেহ পাওয়া যায় মাটিচাপা অবস্থায়।
গত ১০ মার্চ শাহজাহানপুরের শান্তিবাগ ভাঙারি গলি এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মালিক সিকান্দার মিয়াকে কয়েকজন মিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এরপর গত ২৮ জুন রাতে খিলগাঁও থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন দিদারুল ইসলাম। পরদিন ভোরে ওয়ারীর নবাবপুর রোড এলাকা থেকে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ জুলাই রাতে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, যাত্রী সেজে অটোরিকশায় উঠে চালকের সঙ্গে সখ্য তৈরি করার পর তাকে অচেতন করে যানবাহন নিয়ে পালিয়ে যায় একটি চক্র। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দিদারুলের ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা এবং অপরাধে ব্যবহৃত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়।
এদিকে জুলাইয়ে পূর্ব বাড্ডার অটোরিকশাচালক অলিউর রহমান ওরফে অলি নিখোঁজ হন। কয়েক দিন পর উলারটেক এলাকার একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে তার মাটিচাপা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দিদারুলের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অজ্ঞান পার্টির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। যাত্রী সেজে রিকশা বা অটোরিকশায় ওঠা, চালকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি এবং পরে সুযোগ বুঝে তাকে অচেতন করে যানবাহন নিয়ে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের কৌশল।
এদিকে শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গত এক বছরে এই চক্রের খপ্পরে পড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৩২ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোরিকশা ও রিকশাচালকদের নিরাপত্তা বাড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার পাশাপাশি রাতের বেলায় নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, সন্দেহজনক যাত্রীদের বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ এবং চালকদের জন্য দ্রুত জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা দরকার।
একই সঙ্গে ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা যাতে সহজে বিক্রি করতে না পারে, সে জন্য পুরোনো যানবাহনের কেনাবেচার ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।