ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে নানা ধরনের ছাড় দেওয়ার পরও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকায়। মোট বিতরণ করা ঋণের হিসাবে খেলাপি ঋণের হার এখন ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় অনেক গ্রাহক সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। ফলে নিয়মিত ঋণও ধীরে ধীরে খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এক বছর আগে বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা চালু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সেই উদ্যোগেও প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। বরং আগের সুবিধা নেওয়া অনেক গ্রাহক আবারও খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি আরও নমনীয় শর্তে দ্বিতীয়বারের মতো বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঘোষিত বিশেষ সুবিধার আওতায় প্রায় ৩০০ জন ঋণগ্রহীতা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করেন। ওই সুবিধায় দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে আগের সুবিধা নেওয়া অনেক গ্রাহক এখনো গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যেই থাকলেও নতুন প্যাকেজের আওতায় তাদের আবারও আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট ঘোষিত সর্বশেষ প্যাকেজে শর্ত আরও শিথিল করা হয়েছে। এখন ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা গ্রাহকেরা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। পাশাপাশি ঋণ পুনর্গঠনের মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে চার বছর করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আগের সহায়তা দেওয়ার পর থেকেই শিল্প খাত নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রভাব এবং বিভিন্ন সময়ের অর্থনৈতিক চাপ শিল্প খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ঋণ পরিশোধের শর্ত কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতকে পুনরুদ্ধার ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি ফেরাতে স্বল্প সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরলে গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে এবং ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসবে। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এই প্রণোদনা কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবে।