আধুনিক জীবনে মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি মানুষের পকেটের অফিস, ব্যাংক, পাঠাগার, বিনোদনকেন্দ্র—কখনো আবার একাকীত্বের

মোবাইল ফোন: প্রযুক্তির আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ?

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৪ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৯:৫৫ সময় , আপডেট সময় : ২৪ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৯:৫৫ সময়

আধুনিক জীবনে মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি মানুষের পকেটের অফিস, ব্যাংক, পাঠাগার, বিনোদনকেন্দ্র—কখনো আবার একাকীত্বের সঙ্গীও। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম যে জিনিসটির দিকে অনেকেই তাকান, ঘুমাতে যাওয়ার আগে শেষবার যে জিনিসটি হাতে নেন, সেটিও মোবাইল ফোন। প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং ও যোগাযোগসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মূল সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে মানুষ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।


গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে ঘুমের ওপর। রাতে বিছানায় শুয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা বারবার বার্তা দেখার কারণে ঘুমাতে দেরি হয়। ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় বিপুলসংখ্যক গবেষণা বিশ্লেষণ করে কিশোরদের ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে কম ঘুম, ঘুমাতে দেরি করা এবং ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুধু মোবাইলের আলো নয়, ঘুমের সময় মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাসই বড় সমস্যা।


দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখে শুষ্কতা, জ্বালা, ঝাপসা দেখা ও ক্লান্তির মতো সমস্যা হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের বড় একটি সময় পর্দার সামনে কাটলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পাশাপাশি চোখের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে। মোবাইল ব্যবহারের আরেকটি বড় সমস্যা ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের ব্যথা। ফোন দেখার সময় দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে রাখলে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে চাপ পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই ভঙ্গিতে থাকলে তরুণদের মধ্যেও এ ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।


অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে শারীরিক কর্মকাণ্ডও কমে যেতে পারে। হাঁটা, খেলাধুলা বা ব্যায়ামের সময় যদি ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে চলে যায়, তাহলে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।


শুধু শরীর নয়, অতিরিক্ত ও সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্বেগ, বিষণ্ণতার উপসর্গ, আত্মসম্মানবোধের সমস্যা এবং মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি একমুখী নয়। মানসিক সমস্যায় থাকা তরুণরাও অনেক সময় ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় কাটান। ফলে একাকীত্ব থেকে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং অতিরিক্ত ভার্চুয়াল নির্ভরতা থেকে আরও একাকীত্ব—এমন একটি দুষ্টচক্র তৈরি হতে পারে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন, মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়াও মানুষকে বারবার ফোনের দিকে ফিরিয়ে নেয়। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের কিশোরদের মধ্যে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২২ সালে বেড়েছে। এর সঙ্গে কম ঘুম ও রাতে দেরিতে ঘুমানোর সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং দূরে থাকা মানুষদের কাছে আনার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করাই প্রয়োজন।


শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়া দরকার। শিশুকে শান্ত করতে, খাওয়াতে বা পড়াতে নিয়মিত মোবাইল হাতে তুলে দিলে ধীরে ধীরে তার বিনোদন, খাবার, পড়াশোনা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মোবাইলের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নয়। এদিকে মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক উদ্বেগ রয়েছে। মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ নির্গত হয়। তবে এটি এক্সরে বা গামা রশ্মির মতো আয়নকারী বিকিরণ নয়। তাই মোবাইলের বিকিরণকে সব ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


বরং মোবাইল ব্যবহারের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও প্রমাণিত ঝুঁকিগুলোর একটি হলো মনোযোগের বিচ্যুতি। গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলা, বার্তা লেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে চালকের মনোযোগ রাস্তা থেকে সরে যায়। কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতাই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাহলে কি মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে? অবশ্যই নয়। প্রয়োজন হলো সঠিক ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা।


রাতে ঘুমানোর আগে কিছু সময় ফোন দূরে রাখা, বিছানায় ফোন না নেওয়া, দীর্ঘ সময় একটানা পর্দার দিকে না তাকানো, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করা, শিশুদের পর্দা ব্যবহারে অভিভাবকের নজর রাখা এবং খাবারের টেবিল ও পারিবারিক সময়কে মোবাইলমুক্ত রাখা—এসব অভ্যাস অনেক সমস্যাই কমাতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করাও উপকারী। প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছে। মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়। তাই মোবাইল ফোনকে জীবনের নিয়ন্ত্রক না বানিয়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে প্রযুক্তি আমাদের পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, সেটিই যেন আমাদের ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক কেড়ে না নেয়।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯