সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে বইয়ের পাশাপাশি স্কুল ড্রেস, জুতা ও পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা, ঝরে পড়ার হার কমানো এবং দরিদ্র পরিবারের আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে নেওয়া এই কর্মসূচিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি মাসেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বেছে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ড্রেস ও ব্যাগ বিতরণ করা হবে। পরে ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৬ লাখের বেশি স্কুল ড্রেস প্রস্তুতের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেয়েদের জন্য আকাশি রঙের ফ্রক বা টিউনিক এবং ছেলেদের জন্য হালকা নীল জামা ও গাঢ় নীল হাফ প্যান্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। শিশুদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ফিতাবিহীন সাদা জুতাও দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশীয় পাট দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব স্কুল ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি উদ্যোগে বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস সরবরাহে দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও সহযোগিতা করছে। গত ১১ আগস্ট বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল ড্রেস শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে ড্রেস, ব্যাগ ও জুতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও জানিয়েছেন, শিশুদের বিনা মূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ ও আবেগ জড়িত। শিক্ষার প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তবে স্কুল ড্রেস বিতরণ নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই দরিদ্র পরিবারের জন্য এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিনা মূল্যে পোশাক, জুতা ও ব্যাগ দেওয়া হলে পরিবারের শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যয় কমবে এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। একই পোশাক ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্যের প্রকাশও কমবে।
অন্যদিকে শিক্ষাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু পোশাক, জুতা ও ব্যাগ বিতরণ করলেই শিক্ষার মান উন্নত হবে না। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা, শ্রেণিকক্ষের আধুনিকায়ন এবং কার্যকর পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারি পর্যায়ে বড় ধরনের বিতরণ কর্মসূচিতে নিম্নমানের পণ্য, ভুল মাপ, সময়মতো সরবরাহ না হওয়া এবং অনিয়মের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এসব বিষয় কঠোরভাবে নজরদারি করা না হলে সরকারের বড় এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও দিতে পারে।
এদিকে ‘পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি’তে স্কুল ড্রেস, ব্যাগ, জুতা ও মোজা দেওয়ার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পুরো কর্মসূচির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন প্রায় ৩৩ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে শুধু ড্রেস, ব্যাগ, জুতা ও মোজা বিতরণে কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
শুধু প্রাথমিক নয়, মাধ্যমিক পর্যায়েও অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে ড্রেস, জুতা, মোজা ও ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে এ ধরনের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের খাবার, স্বাস্থ্য উপকরণ এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তার ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বিনা মূল্যে স্কুল ব্যাগ বিতরণের জন্য নির্বাচিত বিদ্যালয়ের তালিকা ও শিক্ষার্থীদের সংখ্যা পাঠাতে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিকের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা উপকরণের ব্যয় কমবে। তবে কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে সঠিক শিক্ষার্থী নির্বাচন, মানসম্মত পোশাক ও সামগ্রী সরবরাহ, সময়মতো বিতরণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর।