শ্রীমঙ্গলের সবুজ চা-বাগান দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাহাড়-টিলার ঢেউ খেলানো প্রান্তরজুড়ে সারি সারি চা-গাছ, আঁকাবাঁকা পথ আর পর্যটকদের আনাগোনায় পুরো অঞ্চলজুড়েই তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। কিন্তু এই নয়নাভিরাম দৃশ্যের আড়ালেই দীর্ঘদিন ধরে সংকটে ধুঁকছে দেশের ঐতিহ্যবাহী চা-শিল্প। বাংলাদেশে প্রায় ১৭০ বছরের পুরোনো এই শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। বর্তমানে দেশের ১৭২টি চা-বাগানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন। মৌলভীবাজারেই রয়েছে দেশের সবচেয়ে বেশি চা-বাগান। পাশাপাশি সিলেট ও হবিগঞ্জেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাগান।
তবে সম্ভাবনাময় এই শিল্প এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সেই তুলনায় চায়ের নিলামমূল্য বাড়ছে না। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি, লোডশেডিং, উচ্চ সুদের ঋণ, রপ্তানি কমে যাওয়া এবং বাগানের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় মালিকদের ওপর বাড়ছে চাপ। চা-শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান মজুরি দিয়ে উচ্চমূল্যের বাজারে পরিবার চালানো কঠিন। সম্প্রতি শ্রমিক সংগঠনগুলো দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চা-বাগানে কাজ করেও অনেক শ্রমিক ভূমি ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
অন্যদিকে মালিকপক্ষের বক্তব্য, শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন খরচও সামাল দিতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে নিলামমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগান মালিকদের। তবে সংকটের মধ্যেও চলতি বছর চা উৎপাদনে আশার খবর দিয়েছে চা বোর্ড। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ বছর প্রায় ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চা-শিল্পের আর্থিক সংকট কাটাতে আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এই তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ পুনর্গঠন, নতুন করে চা-গাছ লাগানো এবং কারখানা আধুনিকায়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি কমে যাওয়াই শিল্পটির বড় সংকট। ২০০২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমেছে। গত এক দশকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ শতাংশের বেশি। অথচ নিলামমূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬০ টাকা। বিপরীতে নিলামে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ২০৯ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি চায় প্রায় ৫১ টাকা ঘাটতি ছিল।
এই পরিস্থিতিতে চা-বাগানকে কৃষি খাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের সুপারিশ করেছে চা-শিল্পবিষয়ক টাস্কফোর্স। এটি বাস্তবায়িত হলে ঋণের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। পাশাপাশি চা-বাগানের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা, পুনঃরোপণ কর্মসূচি এবং কারখানা আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। চা রপ্তানি বাড়াতেও বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার, রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিটি চা-বাগানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনঃরোপণ পরিকল্পনা, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে অর্থায়ন, উন্নত সেচব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র চা-চাষিদের সহায়তায় পঞ্চগড়ে চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবও রয়েছে। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স এবং বাগানের সড়ক উন্নয়নের মতো বিষয়ও টাস্কফোর্সের সুপারিশে রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা-শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মালিকদের ন্যায্য দাম, কম সুদের ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী রপ্তানি বাজার—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে হবে। আয় না বাড়লে শ্রমিক কল্যাণও নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শ্রীমঙ্গলের সবুজ চা-বাগান তাই শুধু পর্যটনের সৌন্দর্য নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও হাজারো শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে জড়িত একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। যথাযথ সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে সংকট কাটিয়ে আবারও সম্ভাবনার পথে ফিরতে পারে দেশের চা-শিল্প।