তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা খাতে বেশ কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষবিমুখতা দূর করা, নকলমুক্ত পরীক্ষা, সঠিক মূল্যায়ন এবং গবেষণার সুযোগ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি নিয়ে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ৩৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা, গবেষণা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বৈষম্য কমানো ও শিক্ষার্থী কল্যাণে বেশ কিছু কার্যক্রম এগিয়েছে। আবার কিছু উদ্যোগ রয়েছে অনুমোদন, সম্ভাব্যতা যাচাই ও দরপত্রের পর্যায়ে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দকে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। যা জাতীয় বাজেটের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনার এটিকে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার মান বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো এবং শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে বিনামূল্যে পোশাক, জুতা ও স্কুলব্যাগ দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। পাশাপাশি মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে পাঠদান ব্যবস্থা আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধি, গণিত অলিম্পিয়াড ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো কার্যক্রমও চালুর উদ্যোগ রয়েছে। দীর্ঘ ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণিতে আবারও পৃথক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে বৃত্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষাক্রম সংস্কার, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা কমানো এবং শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধে অগ্রগতি হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ প্রদান এবং মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা চালুর উদ্যোগও রয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান না রেখে গবেষণা ও কর্মসংস্থানমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষণার জন্য অনুদান বাড়ানো, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ সুবিধা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল বিপণনের মতো আধুনিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। সরকার ডিগ্রি পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করার ঘোষণা দিয়েছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের আরও দক্ষ ও স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যও নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল শিক্ষায় ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় ৫ লাখ শিক্ষককে আধুনিক ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম বছরে ১ লাখ ৫০ হাজার, দ্বিতীয় বছরে ২ লাখ এবং তৃতীয় বছরে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার ট্যাব বিতরণের লক্ষ্য রয়েছে। এর সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাপনা, জাতীয় শিক্ষাসামগ্রী ভান্ডার, প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত মুঠোফোন সংযোগ যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গ্রন্থাগার উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন এবং নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ এগিয়ে চলছে। শিক্ষা খাতে গত ছয় মাসের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য আরও কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।