ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় গত মাসে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নজিরবিহীন গোপনীয়তায় দেশটি ছাড়তে হয়েছিল বলে জানা গেছে। প্রথমে খাবার পরিবহনের একটি গাড়িতে আড়ালে এবং পরে ছোট একটি সামরিক বিমানে করে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। বুধবার ১২ আগস্ট ট্রাম্প নিজেও ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৎকালীন পরিস্থিতিতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে পথকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেছিল, সেই পথেই ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এ ঘটনা সরাসরি প্রমাণ করে না যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। বরং প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে কেন নিজের নিরাপত্তার জন্য এতটা গোপনীয়তার সঙ্গে তুরস্ক ছাড়তে হলো।
ইরান এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তেহরান দ্রুত কোনো সমঝোতায় যেতে আগ্রহী নয় বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর ইরানের প্রভাব এখনো রয়েছে। ফলে সংঘাতের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হচ্ছে না।
ট্রাম্পকে আলাদা বিমানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সদস্য, সাংবাদিক ও বিমানকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ট্রাম্পকে আলাদা করে সরিয়ে নেওয়ার পরও তাদের অনেককে আগের বিমানেই ফিরতে হয়েছিল। ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকার অভিযোগ করেছেন, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ট্রাম্প অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তার এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে তিনি দুটি পৃথক হত্যাচেষ্টার মুখে পড়েও বেঁচে যান। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটিতে প্রতিশোধের দাবি আরও জোরালো হয়েছে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্যারেন গিবসনের মতে, ইরান-সমর্থিত কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর গুরুতর হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাদের এমন উদ্দেশ্যের কথা প্রকাশ্যে এসেছে এবং সক্ষমতারও প্রমাণ তারা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে ট্রাম্পও হুমকি দিয়েছিলেন, তার ওপর হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। তবে সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের কিছু হলে তার রেখে যাওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে সরাসরি সিদ্ধান্ত কার্যকর নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ওপর। এদিকে তুরস্কের কিছু কর্মকর্তা সন্দেহ করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই হামলার আশঙ্কা তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি এর পেছনে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের ভূমিকা থাকতে পারে বলেও তারা ধারণা করছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
ন্যাটো সম্মেলনকে ঘিরে তুরস্ক আগে থেকেই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছিল। ট্রাম্পের ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার নিরাপত্তা এবং এয়ারফোর্স ওয়ানের চারপাশে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মীও মোতায়েন করা হয়। সব মিলিয়ে তুরস্ক থেকে ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি—এমন প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের নিজের নিরাপত্তার জন্য নেওয়া এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।