জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে অনড় ছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর চানখাঁরপুলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার শুনানিতে প্রধান কৌঁসুলি অভিযোগের বিভিন্ন অংশ আদালতে তুলে ধরেন, যেখানে ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের বর্ণনা রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে মন্ত্রী, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চলমান আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে নাকি রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনো হবে—এ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সামরিক বাহিনীকে কঠোরভাবে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন। তবে কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, একপর্যায়ে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “তাহলে তোমরা আমাকে গুলি করে মেরে ফেলো, গণভবনে কবর দিয়ে দাও।” অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই রাতেই আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাকে কঠোর অবস্থানে অটল থাকার পরামর্শ দেন। একই সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পরদিন সকালে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রচারের প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পরদিন ৫ আগস্ট সকালে অনুষ্ঠিত আরেকটি বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক জানান, বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এবং অস্ত্র-গোলাবারুদও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ফলে আগের মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর সামরিক কর্মকর্তারা আবারও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে পরিস্থিতির বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানান। তারা জানান, রাজধানীর চারদিক থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ গণভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, পরিবারের সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা এবং বিদেশে থাকা ছেলের সঙ্গে কথা বলার পর শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ ও দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তবে টেলিভিশনে ভাষণ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে গণভবন ত্যাগ করার ব্যবস্থা করা হয়। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই দিন সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রচারের আগেই শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।