একসময় শিক্ষক ছিলেন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী কিংবা বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিত্ব—অনেকেই জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেও শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই মূল্যবোধ যেন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও হামলার একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষা অঙ্গনে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সাবেক রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালাম এবং নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালাম—নিজেদের শিক্ষকদের প্রকাশ্যে সম্মান জানিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁদের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের ওপর হামলা, অপমান এবং লাঞ্ছনার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সামান্য শাসন বা শৃঙ্খলা রক্ষার ঘটনাকেও কেন্দ্র করে অনেক শিক্ষককে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় এক শিক্ষার্থীকে শাসনের জেরে বিদ্যালয়ে ঢুকে প্রধান শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ ওঠে এক অভিভাবকের বিরুদ্ধে। একইভাবে টাঙ্গাইলে শ্রেণিকক্ষে শাসনের ঘটনায় এক শিক্ষককে শিক্ষার্থীর মারধরের শিকার হতে হয়। এসব ঘটনায় শিক্ষা মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে রাজধানীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে এক বিচারপতির বাসভবনে ডেকে নিয়ে অপমান করার অভিযোগও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটি শিক্ষক সমাজের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষককে সম্মান করার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়লে তার নেতিবাচক প্রভাব পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়ে। তারা বলছেন, শিক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশও ব্যাহত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের মতে, শিক্ষককে ভয় নয়, সম্মান করার যে সামাজিক মূল্যবোধ একসময় ছিল, সেটি পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের অন্যতম বড় দাবি।