সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। দুর্যোগে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। এখনো প্রায় অর্ধলক্ষ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের ক্ষতির পর সরকার পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের শনাক্ত করতে একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। সেই তালিকার ভিত্তিতেই খাদ্য, আর্থিক সহায়তা, কৃষি উপকরণ এবং পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে। পুরো কার্যক্রম মাঠ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
সাম্প্রতিক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে পুনর্বাসন, কৃষি পুনরুদ্ধার, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় দেশের ৪৩ জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ও আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন সবজির খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাঁচ লাখেরও বেশি কৃষক। একই সঙ্গে মৎস্য খাতে প্রায় ৪০০ কোটির বেশি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পানির স্রোতে মাছ ও চিংড়ির পোনা ভেসে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য ঘের ও খামার।
প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন খামারিরা। ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অনেক গবাদিপশুও দুর্ভোগে পড়েছে। অন্যদিকে বন্যার পানিতে ডুবে স্থানীয় বাজারের অসংখ্য দোকানের মালামাল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরাও। সরকার জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ কৃষি সহায়তা প্যাকেজের আওতায় বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি দ্রুত বাঁধ, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশুদ্ধ পানি, স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, সাপের বিষের প্রতিষেধক এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। বন্যাপ্রবণ এলাকায় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সভায় অংশ নেওয়া সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা। তাই পুনর্বাসন, কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং জীবিকা পুনর্গঠনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের দুর্যোগ বাড়ছে। তাই পুনর্বাসনের পাশাপাশি আগাম সতর্কতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।